http://শরিফুল ইসলাম :বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণস্পন্দন খুঁজতে গেলে যে শব্দটি সবচেয়ে জোরালোভাবে প্রতিধ্বনিত হয়, সেটি হলো-রেমিট্যান্স। প্রবাসীদের পাঠানো এই অর্থ কেবল পরিবারের মুখে হাসি ফোটায় না, বরং পুরো জাতির অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখার এক অবিচল শক্তি হিসেবে কাজ করে। হাজার মাইল দূরে থাকা প্রিয়জনদের ত্যাগ, পরিশ্রম আর স্বপ্নের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই প্রবাসী আয় আজ বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রার অন্যতম প্রধান ভিত্তি।
সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই মানুষ উন্নত জীবনের সন্ধানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাড়ি জমিয়েছে। আজও সেই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের লাখো মানুষ জীবিকার তাগিদে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। কেউ মধ্যপ্রাচ্যের প্রখর রোদে শ্রম দিচ্ছেন, কেউবা ইউরোপ-আমেরিকার উন্নত নগরীতে কঠোর পরিশ্রম করছেন। তাদের প্রতিটি ঘামবিন্দু যেন রূপ নেয় বৈদেশিক মুদ্রায়, যা দেশে পাঠিয়ে তারা পরিবারের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিকেও শক্তিশালী করছেন।
বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রবাসী আয় এক অমূল্য সম্পদ। রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি এটি বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস। সাম্প্রতিক সময়ে রেমিট্যান্স প্রবাহে যে ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা দেশের অর্থনীতিতে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৪.৪৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। মার্চ মাসেই প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে-যা অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
এই অর্জন নিঃসন্দেহে প্রবাসী বাংলাদেশিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও দেশের প্রতি তাদের অগাধ ভালোবাসার প্রতিফলন। তাদের পাঠানো অর্থের ওপর ভর করেই দেশের আমদানি ব্যয় নির্বাহ, বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য রক্ষা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে।
তবে বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশ চাইলেই স্বল্প সময়ে রপ্তানি আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে না। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বৃদ্ধি করা তুলনামূলক সহজ। তাই বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রা সংকট মোকাবিলায় রেমিট্যান্স বৃদ্ধির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া সময়ের দাবি।
এক্ষেত্রে প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী তৈরি করতে পারলে বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে কম খরচে নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে শ্রমিক পাঠানোর ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে। অবৈধ অভিবাসন বন্ধ করে বৈধ চ্যানেলে শ্রমিক প্রেরণ নিশ্চিত করা গেলে দেশের জন্য সুফল বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো। এখনো অনেক প্রবাসী অনানুষ্ঠানিক পথে অর্থ পাঠান, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে যুক্ত হয় না। যদি সকল প্রবাসীকে ব্যাংকিং চ্যানেলে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করা যায়, তবে দেশের অর্থনীতিতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটতে পারে। এতে যেমন রিজার্ভ শক্তিশালী হবে, তেমনি টাকার মানও স্থিতিশীল থাকবে। পাশাপাশি অর্থপাচার কমে আসবে, যা সরাসরি দেশের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রবাসীরা শুধু অর্থই পাঠান না, তারা পাঠান ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ এবং দেশের প্রতি অটুট বন্ধনের এক অনন্য বার্তা। তাদের এই অবদান যথাযথ মর্যাদা দেওয়া এবং তাদের জন্য নিরাপদ ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের মহাসড়কে এগিয়ে চলছে, তার পেছনে প্রবাসীদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের স্বপ্ন, ত্যাগ আর ভালোবাসার ওপর দাঁড়িয়ে গড়ে উঠছে আগামীর সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। তাই এই শক্তিকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করতে এখনই সময় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার-যাতে প্রবাসীদের পাঠানো প্রতিটি টাকার সঠিক মূল্যায়ন হয় এবং তা দেশের টেকসই উন্নয়নে সর্বোচ্চ ভূমিকা রাখতে পারে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, রেমিট্যান্স শুধু অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়-এটি একটি জাতির আবেগ, সংগ্রাম ও সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। প্রবাসীদের এই অবদানকে সম্মান জানিয়ে, তাদের পাশে থেকে এবং সঠিক নীতিনির্ধারণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও এক ধাপ এগিয়ে যেতে পারে একটি শক্তিশালী, স্বনির্ভর অর্থনীতির পথে।
প্রবাসীরা শুধু দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি নন, তারা একেকজন নীরব যোদ্ধাযাদের ঘাম আর ত্যাগে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। তাই তাদের কল্যাণ, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। প্রবাসীদের জন্য যা যা করা জরুরি, তা শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি এক ধরনের নৈতিক অঙ্গীকারও।
প্রথমত, দক্ষ জনশক্তি তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ভাষা, প্রযুক্তি ও কারিগরি দক্ষতায় প্রশিক্ষিত কর্মী তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা যেমন ভালো বেতন পাবেন, তেমনি দেশের জন্য বেশি রেমিট্যান্স পাঠাতে সক্ষম হবেন।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে কর্মসংস্থানের প্রক্রিয়াকে সহজ, স্বচ্ছ ও কম খরচের করতে হবে। অনেক সময় দালালচক্রের কারণে শ্রমিকদের অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয়, এমনকি প্রতারণার শিকারও হন। এ অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে সরকারকে কঠোর নজরদারি ও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রবাসীদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক দেশে বাংলাদেশি শ্রমিকরা নানা ধরনের বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার হন। সংশ্লিষ্ট দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়ে তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। দূতাবাসগুলোকে আরও সক্রিয় ও সেবামুখী করতে হবে।
চতুর্থত, ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে উৎসাহ দিতে হবে। এজন্য সহজ ও দ্রুত লেনদেন ব্যবস্থা, প্রণোদনা (ইনসেনটিভ) এবং কম চার্জ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে বৈধ পথে অর্থ আসবে এবং দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হবে।
পঞ্চমত, দেশে ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অনেক প্রবাসী জীবনের সঞ্চয় নিয়ে দেশে ফেরেন, কিন্তু সঠিক দিকনির্দেশনা না থাকায় তারা ব্যবসা বা বিনিয়োগে ব্যর্থ হন। তাদের জন্য সহজ ঋণ, প্রশিক্ষণ ও উদ্যোক্তা সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে তারা দেশের অর্থনীতিতে নতুনভাবে অবদান রাখতে পারবেন।
ষষ্ঠত, প্রবাসীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যসেবা, বীমা সুবিধা এবং জরুরি সহায়তা চালু করা প্রয়োজন। দুর্ঘটনা, অসুস্থতা বা মৃত্যুর ক্ষেত্রে দ্রুত সহায়তা পেলে তাদের পরিবার অনেকটাই সুরক্ষিত থাকবে।
সপ্তমত, প্রবাসীদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। তারা যেন দেশে ফিরে সম্মান ও স্বীকৃতি পান, সে পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। গণমাধ্যমে তাদের অবদান তুলে ধরা এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা প্রদান করা যেতে পারে।
সবশেষে, প্রবাসীদের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো উচিত। অনলাইন সেবা, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও হেল্পলাইন চালুর মাধ্যমে তারা যেন সহজেই সরকারি সেবা পেতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রবাসীরা দেশের গর্ব, দেশের শক্তি। তাদের জন্য নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ শুধু তাদের জীবনকে সহজ করবে না, বরং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে। তাই এখনই সময়, প্রবাসীবান্ধব নীতি ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে তাদের পাশে দাঁড়ানোর।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট