লেখক: মো. বেল্লাল হাওলাদার সাংবাদিক ও সংগঠক
২৯ এপ্রিল ২০২৬, ৬:৩২ পূর্বাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

একটি মৃত্যু, এক অমর আলিঙ্গন: বিবেকের সামনে কঠিন প্রশ্ন

বুলেট বৈরাগীর নিথর দেহে স্ত্রীর অন্তিম আলিঙ্গনের হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ায় নাড়িয়ে দিয়েছে দেশজুড়ে মানুষের বিবেককে।
দৃশ্যটি কোনো সিনেমার কাহিনী নয়, ছিলো না কোনোরূপ স্ক্রিপ্ট, কোনো ক্যামেরা ছিলো না, ছিলো না কোনো অভিনয়। এটি নির্মম এক ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক সত্য ঘটনা । আর এ ঘটনায় যেন থমকে দাঁড়িয়েছিলো সময়। বুলেট বৈরাগীর নিথর দেহকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন অসহায় এক স্ত্রী। সেই আলিঙ্গনে ছিলো না জীবনের স্পন্দন, ছিলো শুধু হাহাকার, বরং ছিলো প্রিয়জন হারানোর ব্যথা, না বলা হাজারো কথার ভার! ভালোবাসা যেন মৃত্যুকেও হার মানাতে চাইছে শেষবারের মতো।

আমাদের সমাজ কখনো কি ভেবে দেখে? একজন পুরুষ কি সত্যিই উপলব্ধি করতে পারেন তাঁর স্ত্রীর অন্তরের সেই গভীর ভালোবাসা? অথবা সেই মরমে বেদনার তীব্রতা? যে আলিঙ্গনে একসময় ছিলো উষ্ণতা, নিরাপত্তা, জীবনের পূর্ণতা। আজ সেই একই আলিঙ্গনে নিথর দেহের রূপ নিয়ে দাঁড়িয়েছে অসীম শূন্যতার প্রতীক হয়ে। জীবন্ত শরীরে যে স্পর্শে তৃপ্তি ছিলো, যে ভালোবাসা পূজার মতো পবিত্র অনুভবে ভেসে উঠতো সেই স্পর্শ আজ কেবল স্মৃতি, ব্যথা আর আপনকে হারানোর উপাখ্যান।

এই দৃশ্য যেন মনে করিয়ে দেয় কিছু কালজয়ী চলচ্চিত্রের বিশেষ মুহূর্ত, যেখানে মৃত্যু এসেও আলাদা করতে পারেনি পবিত্র ভালোবাসাকে। যেমন টাইটানিকের সেই শেষ দৃশ্য, কিংবা বোম্বে সিনেমার হৃদয়স্পর্শী মুহূর্ত, যেখানে মৃত্যুর পরও দু’জন একে অপরকে জড়িয়ে থাকে, যেন ভালোবাসা শেষ নিশ্বাসের পরেও বেঁচে থাকে। বাস্তবের এই দৃশ্য যেন সেইসব কল্পনাকেও হার মানিয়েছে। এই দৃশ্য দেখে বিবেকবান মানুষের চোখে শুধু জল আনেনি, ভেতরটাও নাড়িয়ে দিয়ে গেছে সমাজ ও নির্মাতাদের। প্রশ্নবিদ্ধ আমাদের মানবিকতা, নিরাপত্তা আর সামাজিক বাস্তবতা ঘিরে।
কুমিল্লার আলোচিত কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর নির্মম হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, এটি যেন এক অপূর্ণ ভালোবাসার গল্প। যে গল্পের কোনো শেষ নেই। বেদনাদায়ক সত্য, নিজের ছোট্ট শিশু সন্তানকে রেখে চলে যেতে হয়েছে না ফেরার দেশে। যে শিশুটি জীবনের প্রথম জন্মদিনেই হারিয়েছে তার জন্মদাতাকে। জন্মদিনের কেকের হাসির বদলে নেমে এসেছে শোকের মাতম। নিষ্পাপ শিশুটির শৈশব শুরুই হলো শূন্যতা দিয়ে! এ যেন এক নির্মম নিয়তির পরিহাস।

শুধু স্ত্রী নন, সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়েছেন মা-বাবাও। সন্তানের নিথর দেহের পাশে তাদের বিলাপ যেন আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলেছে। সেই কান্না শুধু একটি পরিবারের নয় এ যেন পুরো জাতির কান্নার প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে। যে দৃশ্য দেখলে পাথর হৃদয়ও নরম হয়ে যায়, সেখানে প্রশ্ন জাগে
মানুষ এত নিষ্ঠুর হয় কীভাবে?

কিন্তু প্রশ্নগুলো এখানেই থেমে থাকে না। বিচার কি হবে? যদিও আসামিরা ধরা পড়েছে এতে কিছুটা স্বস্তি এসেছে মানুষের মনে, কিন্তু তারপর? শুধু আসামি গ্রেপ্তারই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার। যেখানে মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে না। মামলার ফাঁকফোকর, আইনের দীর্ঘসূত্রতা আর প্রভাবের খেলায় হয়তো এক সময় তারা বেরিয়ে আসবে আবারও মুক্ত বাতাসে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার কি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন হবে, নাকি অন্য অনেক মামলার মতোই দীর্ঘসূত্রতায় হারিয়ে যাবে? নাকি আবার নতুন কোনো পরিবার শোকের সাগরে ডুবে যাবে এদের নিষ্ঠুর নির্মমতায়। এই চক্র আর কতদিন চলবে?
এই প্রশ্ন শুধু আবেগের নয়, এটি আমাদের বিচারব্যবস্থা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর প্রতি এক কঠিন জিজ্ঞাসা।
এইতো কদিন আগের পরিসংখ্যান বলছে ভয়ংকর বাস্তবতা। এপ্রিল মাসের প্রথম ১৫ দিনেই রাজধানীতে অন্তত ১৬টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাত্র তিন মাসে ঢাকায় ১০৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সারা দেশে এই সময়ে খুনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৫৪ এর মতো। প্রতিটি সংখ্যার পেছনে আছে একটি করে ভাঙা পরিবার, একটি করে অপূর্ণ গল্প। দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও একই চিত্র। কোথাও ব্রাশফায়ার, কোথাও কুপিয়ে হত্যা, কোথাও চাঁদাবাজির জেরে প্রাণনাশ! রাজধানীসহ সারা দেশে খুনের সংখ্যা বাড়ছে। তাহলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতে বিদ্যমান ব্যবস্থার কার্যকারিতা কোথায়? সব মিলিয়ে যেন এক অস্থির সময় পার করছে এ দেশ।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, সন্ত্রাসীদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো
শীর্ষ সন্ত্রাসীরা এখনও সক্রিয়। কেউ দেশের বাইরে বসে, কেউ জামিনে বেরিয়ে আবারও গড়ে তুলছে তাদের প্রভাব। ফোনের ওপারে ভেসে আসে হুমকি, চাঁদা না দিলে জীবন দিতে হবে। গ্রেপ্তারের পরও যদি অপরাধচক্র সক্রিয় থাকে, তবে গোয়েন্দা নজরদারি ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার ঘাটতি কোথায়? এই ভয়, এই আতঙ্ক, এই অনিশ্চয়তা সব মিলিয়ে মানুষ যেন নীরব হয়ে যাচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করতে চায় না, কারণ সে জানে পরের লক্ষ্য হতে পারে সে নিজেই। তবুও সবচেয়ে বেশি নাড়া দেয় সেই একটি দৃশ্য, একজন স্ত্রী তার স্বামীর নিথর দেহ আঁকড়ে ধরে আছেন। সেই আলিঙ্গন যেন বলে ভালোবাসা শেষ হয়নি, কিন্তু জীবন হঠাৎ থেমে গেছে।
আমাদের এই লাল-সবুজের বাংলাদেশ, যার প্রকৃতিক সৌন্দর্য , নদী-নালা, সবুজে ঘেরা দেশ মানুষকে মানবতা শেখায়, ভালোবাসা শেখায়, সহমর্মিতা শেখায়, সেই দেশেই কীভাবে জন্ম নেয় এমন নিষ্ঠুরতা? এমন প্রকৃতির কোলে বড় হয়ে মানুষ কীভাবে এত হিংস্র হয়ে ওঠে? মনে হয়, ওদের এই পাষাণ হৃদয় এ সৌন্দর্যের ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত অথবা ধিকৃত কোনো অশরীরী আত্মা এদের! তাদের ভেতরে নেই ভালোবাসা, নেই মমতা, নেই মানবিকতার ছোঁয়া। তারা যেন প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এক অন্ধকার জগতে বাস করে, যেখানে জীবন মানে শুধু ক্ষমতা আর ভয় দেখানো।

তবুও প্রশ্ন রয়ে যায় কবিতা, উপন্যাস, ফিচার লেখনীতে কি বিবেক জাগানো যায়? হয়তো না। বিবেকহীন মানুষকে শব্দ দিয়ে বদলানো কঠিন। কিন্তু সত্য তুলে ধরা, সমাজকে সচেতন করা, প্রশ্ন তোলা,
দ্রুত সময়ে সঠিক বিচার, এসবই হয়তো পরিবর্তনের প্রথম ধাপ। এই চক্র ভাঙার দায়িত্ব কে নেবে; রাষ্ট্র, নাকি নীরব সমাজ? এভাবে আর কত, আর কত শিশুর জন্মদিন হবে শোকের দিন?
সমাজ, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার সামনে আজ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ মানুষের মনে নিরাপত্তার বিশ্বাস ও আস্থা ফিরিয়ে আনা। কারণ, একটি দেশের আসল শক্তি মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিকতার সঠিক বিকাশ। আর সেই দিনই হবে সত্যিকার অর্থে অর্থপূর্ণ, যেদিন কোনো স্ত্রীকে আর তার প্রিয় মানুষকে এভাবে শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরে অকাল বিদায় জানাতে হবে না, যেদিন ভালোবাসা হারবে না অনিশ্চিত জীবনের কাছে।

 

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://amaderbashundhara.com/archives/1181" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টোকিওতে তারেক–তাকাইচি আলোচনা: জাপানি পুঁজিকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ

১

শ্রীপুরে মাদকাসক্ত ছেলের লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল বাবার

২

মাদক মামলার আসামি, কে এই রবিউল ইসলাম ওরফে মিঠু মুন্সি?

৩

নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যে ফেনী সদর যুবদলের নিজাম পাটোয়ারী ও শাহাদাতকে অব্যাহতি

৪

সাংবাদিক হত্যা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে শ্রীপুরে সাংবাদিকদের কর্মসূচি

৫

অবিচার ছাপিয়ে সত্যের জয়: বঞ্চনার ১৭ বছর পর জনপ্রশাসন সচিব হলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী

৬

এসএসপি নেতা আবদুল মান্নানের বোনজামাই মোছুদের রহমানের ইন্তেকাল, সভাপতি-সম্পাদকের শোক

৭

ডিবি পুলিশের অভিযান : লৌহজংয়ে মালিরঅংক থেকে হেরোইনসহ ৪ জন গ্রেপ্তার

৮

৪২৩ জনের কারাগারে ২১৬৪ বন্দী ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ, কারাগারে চরম চাপ

৯

একদিকে রাড্ডা অন্যদিকে সমবায় সমিতি মাঝখানে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন থমথমে অবস্থা মিরপুরে বিএনপির রাজনীতি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কেন নীরব দায়ভার কার?

১০

ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিদায়ে শাহআলী এলাকাবাসীর উদ্বেগ: নেপথ্যে কি চাঁদাবাজ ও মাদকচক্রের ষড়যন্ত্র!

১১

উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো এসএসপির ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

১২

এসএসপি দপ্তর সম্পাদক মীম আক্তারের পিতার ইন্তেকাল, নেতৃবৃন্দের শোক

১৩

কেউ বলে মামলাবাজ কেউ বলে প্রতারক কে এই মিরপুরের হান্নান?

১৪

ঝিনাইদহে ব্যবসায়ীকে চাঁদা ও জমি দখলের হুমকির অভিযোগ

১৫

ফেনীতে কৃষকদল নেতা আমিনুল হক বহিষ্কার

১৬

​১ গানে ১৬৩ মিলিয়নের অধিক ভিউয়ের মাইলফলক: উদযাপিত হলো শিশুশিল্পী সুরাইয়া আক্তার সাইফার ‘গোল্ডেন প্লে বাটন সেলিব্রেশন’

১৭

হেফাজতে নারী ব্যবসায়ীকে মারধর, উঠেছে নানা প্রশ্ন

১৮

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত পরিদর্শন করেন গঙ্গাচড়ায় প্যারাগন গ্রুপের ডেইরি ফার্ম 

১৯

চন্দ্রিমা মডেল টাউনে অনুমোদনহীন ১৮ তলা ভবন নীরব রাজউক

২০

একটি মৃত্যু, এক অমর আলিঙ্গন: বিবেকের সামনে কঠিন প্রশ্ন

29 April 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
Amaderbasundara
www.amaderbashundhara.com