মানুষকে চেনা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। কারণ মানুষ তার মুখটি সবার সামনে রাখে, কিন্তু চরিত্রটি লুকিয়ে রাখে সময়ের কাছে। পোশাক মানুষকে আকর্ষণ করতে পারে, সৌন্দর্য চোখকে থামিয়ে দিতে পারে, অর্থ মানুষকে বিস্মিত করতে পারে, আর কথার মাধুর্য বিশ্বাস করাতে পারে। কিন্তু কোনো কিছুই একজন মানুষের প্রকৃত চরিত্রের নিশ্চয়তা দেয় না। মানুষ আসলে কেমন, তা বোঝা যায় তখনই, যখন তার স্বার্থের সঙ্গে আপনার স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়, যখন তার সামনে নিজের লাভের সুযোগ থাকে এবং অন্যদিকে থাকে নৈতিকতার কঠিন পরীক্ষা। তখনই বোঝা যায়, তার কথাগুলো সত্যিই বিশ্বাসের জায়গা থেকে বলা হয়েছিল, নাকি সেগুলো ছিল কেবল প্রয়োজনের মুহূর্তে তৈরি করা কিছু সুন্দর শব্দ।
কিছু মানুষ কথাকে এমন এক শিল্পে পরিণত করে, যেখানে সত্যের চেয়ে স্বপ্নের দাম বেশি। তারা ভবিষ্যতের এমন ছবি আঁকে, যা শুনতে ভালো লাগে, বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। মানুষ তখন বাস্তবতা দিয়ে নয়, আশার চোখ দিয়ে তাদের বিচার করে। কেউ চাকরির স্বপ্ন দেখায়, কেউ ব্যবসার বড় সুযোগের কথা বলে, কেউ অর্থনৈতিক উন্নতির গল্প শোনায়, আবার কেউ এমনভাবে নিজের সামর্থ্য ও পরিচয় তুলে ধরে যেন তার হাতে অন্যের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের মুহূর্ত আসে, তখন দেখা যায় স্বপ্নের প্রাসাদটি আসলে কথার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। মানুষের সরলতা, বিশ্বাস ও ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষাকে যারা নিজের স্বার্থ হাসিলের উপায় হিসেবে ব্যবহার করে, তারা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না। তারা মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতাটাকেও ধীরে ধীরে হত্যা করে।
অর্থের লেনদেনের জায়গায় মানুষের চরিত্র সবচেয়ে নির্মমভাবে প্রকাশ পায়। একজন মানুষ যখন নিজের কষ্টার্জিত অর্থ অন্যের হাতে তুলে দেয়, তখন সে শুধু টাকা দেয় না, সে তার বিশ্বাসটুকুও দিয়ে দেয়। সেই অর্থের সঙ্গে হয়তো জড়িয়ে থাকে পরিবারের প্রয়োজন, সন্তানের ভবিষ্যৎ, চিকিৎসার খরচ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় কিংবা নিজের কোনো অপূর্ণ স্বপ্ন। তাই টাকা ফেরত না পাওয়ার কষ্টের চেয়েও বড় কষ্ট হলো একদিন বুঝতে পারা, যাকে বিশ্বাস করে নিজের প্রয়োজনের অর্থ তুলে দিয়েছিলাম, সে হয়তো সেই বিশ্বাসকেই নিজের সবচেয়ে বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করেছে। তখন মানুষ শুধু অর্থ হারায় না। হারায় সম্পর্কের প্রতি আস্থা, মানুষের প্রতি বিশ্বাস এবং নিজের সিদ্ধান্তের ওপর আত্মবিশ্বাসও।
সময়েরও একটি অদ্ভুত দর্শন আছে। সময় কাউকে তাড়া করে না, কাউকে অভিযুক্তও করে না। শুধু নীরবে সবকিছু প্রকাশ করে। যে মানুষ আজ বলে ‘কাল দেব’, কাল সে বলে ‘পরশু দেব’, পরশু বলে ‘আগামী সপ্তাহে দেব’, তারপর মাস, বছর পেরিয়ে যায়। অথচ তার প্রতিশ্রুত সেই শেষ সময় কখনো শেষ হয় না। কথার ভাষায় যাকে বলা যায় ‘ইলেভেনথ আওয়ার’, তার কাছে সেটিও যেন অনন্তকাল। কিন্তু সত্য হলো, সমস্যাটি সবসময় সময়ের নয়। অনেক সময় সমস্যাটি ইচ্ছার। যে মানুষ সত্যিই দায়িত্বশীল, সে সমস্যায় পড়লেও সত্য কথাটি বলে, পাওনাদারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং সমাধানের চেষ্টা করে। আর যে মানুষ দায় এড়াতে চায়, সে সময়কে অজুহাত বানায়, নীরবতাকে ঢাল বানায় এবং একের পর এক নতুন গল্প তৈরি করে।
আর যখন সত্যের সামনে মিথ্যা দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কিছু মানুষ যুক্তির বদলে কুৎসাকে বেছে নেয়। অর্থের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের গল্প তৈরি করা, নারীকে সামনে এনে অপমান বা চরিত্রহননের চেষ্টা করা, কিংবা এমন কোনো প্রসঙ্গ তৈরি করা যাতে মূল অভিযোগটি মানুষের চোখের আড়ালে চলে যায়, এসব কোনো সমস্যার সমাধান নয়। এগুলো সত্য থেকে পালানোর কৌশল। কারও কাছে অর্থের হিসাব চাওয়া অপরাধ নয়, পাওনা ফেরত চাওয়া অপমান নয়, আর নিজের অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা চরিত্রের দুর্বলতা নয়। একটি আর্থিক অভিযোগের উত্তর হওয়া উচিত স্বচ্ছ হিসাব, প্রমাণ এবং দায়িত্বশীল আচরণ। অন্যের সম্মান নষ্ট করে নিজের দায় মুছে ফেলা যায় না; বরং এতে মানুষের চোখে সন্দেহ আরও গভীর হয়।
জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলগুলোর একটি হলো আমরা মানুষকে তার প্রদর্শিত জীবন দিয়ে বিচার করি। দামি পোশাক, সুন্দর চেহারা, বিলাসবহুল গাড়ি, বড় বাড়ি, অভিজাত পারিবারিক পরিচয় কিংবা সমাজের প্রভাব, এসব দেখে আমরা অনেক সময় একজন মানুষ সম্পর্কে এমন ধারণা তৈরি করি, যেন এগুলোই তার চরিত্রের সার্টিফিকেট। অথচ বাহ্যিক সৌন্দর্য আর নৈতিক সৌন্দর্য এক জিনিস নয়। একজন মানুষ খুব সুন্দরভাবে পোশাক পরতে পারে, খুব সুন্দর করে কথা বলতে পারে, সমাজে অত্যন্ত সম্মানজনক অবস্থানে থাকতে পারে। কিন্তু তার ভেতরে যদি সততার অভাব থাকে, তাহলে সেই সমস্ত চাকচিক্য কেবল একটি সুন্দর মুখোশ। আবার বিপরীতে, সাধারণ পোশাকের একজন মানুষ হয়তো নিজের সামান্য সামর্থ্যের মধ্যেও অন্যের অধিকারকে সম্মান করে, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং কারও বিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে না। মানুষের মূল্য তাই তার বাহ্যিক অবস্থানে নয়, তার অন্তরের নৈতিকতায়।
দর্শনের ভাষায় বলা যায়, মানুষের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ পায় তখনই, যখন তার লাভের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় এবং দায়িত্বের সময় শুরু হয়। আপনি একজন মানুষকে তখনই সবচেয়ে ভালোভাবে চিনবেন, যখন আপনার কাছ থেকে তার আর কিছু পাওয়ার নেই, কিন্তু আপনার প্রতি তার একটি দায়িত্ব রয়ে গেছে। সে তখন কী করে, সেটিই তার আসল পরিচয়। আপনার প্রশংসা করার প্রয়োজন যখন নেই, তখনও সে আপনাকে সম্মান করে কি না; আপনার কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার পরও সে আপনার প্রয়োজনের কথা মনে রাখে কি না। নিজের ভুল হলে তা স্বীকার করার মতো সাহস তার আছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তরেই একজন মানুষের চরিত্র লুকিয়ে থাকে। কারণ অভিনয় করা যায় কথায়, পোশাকে, আচরণে এবং সামাজিক পরিচয়ে; কিন্তু দীর্ঘদিন দায়িত্বশীল থাকার অভিনয় করা যায় না।
তাই মানুষ চিনতে তাড়াহুড়ো করার প্রয়োজন নেই। কাউকে তার প্রথম কথায় বিশ্বাস করারও প্রয়োজন নেই, আবার প্রথম ভুলে তাকে সম্পূর্ণ বিচার করারও প্রয়োজন নেই। মানুষকে সময় দিন, তার আচরণ দেখুন, তার প্রতিশ্রুতির পরিণতি দেখুন। সে সুবিধার সময় যেমন থাকে, অসুবিধার সময়ও তেমন থাকে কি না, তা দেখুন। সে আপনার সামনে যেমন, আপনার অনুপস্থিতিতেও তেমন কি না, তা দেখুন। কারণ মানুষকে চেনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আয়না হলো তার ধারাবাহিক আচরণ। সময়ের সঙ্গে যে মানুষ একই থাকে, তার ওপর বিশ্বাস করা যায়; আর যে মানুষ পরিস্থিতি বদলালেই নিজের চরিত্র বদলে ফেলে, তার চাকচিক্য যতই বেশি হোক, তার ভেতরটা ততটাই অনিশ্চিত।
শেষ পর্যন্ত জীবন আমাদের একটি কঠিন সত্য শেখায়, সব সুন্দর মানুষ ভালো নয়, সব মিষ্টি কথা সত্য নয়, সব বড় পরিচয়ের মানুষ বড় মনের মানুষ নয় এবং সব হাসিমুখের আড়ালে নির্মল হৃদয় থাকে না। পৃথিবীতে মুখোশের অভাব নেই; অভাব শুধু এমন মানুষের, যারা মুখোশ ছাড়াই মানুষের সামনে দাঁড়াতে পারে। তাই কাউকে তার সম্পদ দিয়ে নয়, তার সততা দিয়ে বিচার করুন; পোশাক দিয়ে নয়, তার চরিত্র দিয়ে বিচার করুন; কথার মাধুর্য দিয়ে নয়, প্রতিশ্রুতি রক্ষার ইতিহাস দিয়ে বিচার করুন। কারণ টাকা হারালে মানুষ আবার টাকা উপার্জন করতে পারে, কিন্তু বিশ্বাস হারালে সেই ক্ষত অনেক গভীর। আর মানুষের বিশ্বাস নিয়ে যারা খেলতে শেখে, তারা হয়তো কিছু সময়ের জন্য সফল হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের তৈরি মিথ্যার কাছেই পরাজিত হয়।
মানুষ অভিনয় করতে পারে, মুখোশ পরতে পারে, সত্যকে আড়াল করতে পারে, কিন্তু সময় কখনো অভিনয় করে না। সময় একদিন প্রত্যেক মানুষের মুখোশ খুলে দেয়।
মন্তব্য করুন