ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী ধারণক্ষমতা মাত্র ৪২৩ জন। অথচ সেখানে বন্দী রয়েছে ২ হাজার ১৬৪ জন। অর্থাৎ নির্ধারিত ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণেরও বেশি বন্দীকে একই কারাগারে রাখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত বন্দীর চাপ সামলাতে গিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে যেমন হিমশিম খেতে হচ্ছে, তেমনি বন্দীদেরও গাদাগাদি করে থাকতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন্দীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় কারাগারের অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নের জন্য ২০১৫ সালে একটি বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে কাজ শুরু হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা শেষ হয়নি। কয়েক দফা সময় ও ব্যয় বাড়ানোর পরও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ না হওয়ায় কারাগারের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক ব্যবস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি নিয়ে দুই ধরনের হিসাব পাওয়া যাচ্ছে। গণপূর্ত অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দাবি, প্রকল্পের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। অন্যদিকে কারা কর্তৃপক্ষের দৃশ্যমান পর্যবেক্ষণে কাজের অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।
জানা যায়, ২০১৫ সালে ‘ময়মনসিংহ কারাগার সম্প্রসারণ ও আধুনিকীকরণ’ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২৭ কোটি ২৭ লাখ টাকা। প্রকল্পের আওতায় প্রায় দুই হাজার বন্দী রাখার সক্ষমতা তৈরিসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে তা শেষ করার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরে প্রকল্পের নকশা ও ভবনের আয়তনে পরিবর্তন, করোনাকালীন প্রতিবন্ধকতা এবং ডিপিপি সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্পের প্রথম সংশোধন করা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে প্রায় ২৪০ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। একই সঙ্গে কাজের প্যাকেজও ১৩টি থেকে বাড়িয়ে ৩০টি করা হয়। বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব প্যাকেজের কাজ করছে।
কারাগার সম্প্রসারণ প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বন্দীদের রাখার স্থান নিয়েও তৈরি হয়েছে সংকট। কারাগারের একটি অংশের কাজ শেষ হলেও সেখানে বন্দীদের স্থানান্তর করতে হয়েছে।
কারা কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, নারী বন্দীদের জন্য নির্ধারিত অংশের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ায় সেখানে বর্তমানে পুরুষ বন্দীদের রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে নতুন নির্মাণকাজের জন্য পুরুষ বন্দীদের নির্ধারিত পুরোনো স্থান খালি রাখা হয়েছে।
অতিরিক্ত বন্দীর চাপ সামলাতে গত দুই মাসে ময়মনসিংহ কারাগারে রাখার জন্য পাঠানো অন্তত ১ হাজার ৮০০ বন্দীকে পার্শ্ববর্তী তিন জেলার কারাগারে স্থানান্তর করা হয়েছে বলে কারা সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কারাগার সূত্র বলছে, প্রতিদিন নতুন বন্দী আসছেন। একই সঙ্গে জামিনে ও সাজা শেষে কিছু বন্দী মুক্তিও পাচ্ছেন। তবে সার্বিকভাবে বন্দীর সংখ্যা ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি থাকায় জায়গা সংকট কাটছে না।
সম্প্রতি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া এক ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অতিরিক্ত বন্দীর কারণে অনেক সময় গাদাগাদি করে থাকতে হয়। টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়। কারাগারে যাওয়ার পর তাঁর শরীরে চুলকানির সমস্যাও দেখা দিয়েছিল বলে জানান তিনি।
প্রকল্পের তদারকির দায়িত্বে থাকা গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজহার আলী বলেন, প্রকল্পের সামগ্রিক কাজের প্রায় ৭৫ শতাংশ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, পুরোনো স্থাপনা দ্রুত অপসারণের জন্য ঠিকাদারকে চাপ দেওয়া হচ্ছে। পুরোনো স্থাপনা সরানো গেলে সেখানে নতুন ভবন নির্মাণের কাজ আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
তবে ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার মো. সোহরাব হোসেন বলেন, প্রকল্পের কাজ চলমান থাকায় বন্দীদের ব্যবস্থাপনায় সমস্যা হচ্ছে। কারাগারের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নির্মাণকাজ চলায় স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনাতেও নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি হচ্ছে।
প্রকল্পের অগ্রগতি সম্পর্কে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে নির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই জানিয়ে তিনি বলেন, দৃশ্যমানভাবে মনে হচ্ছে কাজের অগ্রগতি ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের বেশি নয়।
কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় এত বেশি বন্দী রাখার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় বন্দীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও বেড়েছে। কাজ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণ খতিয়ে দেখে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন।
ময়মনসিংহের এই পুরোনো কারাগারটি অবিভক্ত বাংলায় ১৭৯২ সালে যাত্রা শুরু করে। ১৯৯৭ সালে এটি কেন্দ্রীয় কারাগারে উন্নীত হয়। দীর্ঘ সময় ধরে বন্দীর সংখ্যা ও কারাগারের অবকাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য না থাকায় সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্প নেওয়া হলেও প্রায় এক দশক পরও পুরো কাজ শেষ না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে।