বিশেষ প্রতিবেদক : রাজধানী ঢাকাকে একটি সুপরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউকের) প্রচেষ্টা দীর্ঘদিনের। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে রাজধানীকে কয়েকটি জোনে ভাগ করে ১৫২৮ বর্গ কিলোমিটার জায়গা ব্যাপ্তিতে ভবন নির্মাণের জন্য ফ্লোর এরিয়া রেশিও (ফার)সহ ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত একটি সুনির্দিষ্ট ও সময়োপযোগী গাইডলাইন প্রদান করে থাকে রাজউক। ভবন নির্মাণকারীরা রাজউকের নির্দিষ্ট গাইডলাইন মেনে ভবন নির্মাণের জন্য আবেদন করলে তদন্ত সাপেক্ষে সেই মর্মে রাজউক অনুমোদন প্রদান করে থাকে বলে জানা যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর কয়েকটি এলাকাতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে রাজউকের অনুমোদন না নিয়েই সুউচ্চ ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতায় নেমেছে কয়েকটি হাউজিং কোম্পানি, ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান সহ কতিপয় অসাধু ব্যক্তিবর্গ। এক্ষেত্রে সবথেকে এগিয়ে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চন্দ্রিমা মডেল টাউন, বসিলা হাউজিং,রাজধানী হাউজিং সহ সংশ্লিষ্ট এলাকার কয়েকটি ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান ও কিছু দুর্নীতি পরায়ণ ব্যক্তিবর্গ। রাজধানীর চন্দ্রিমা মডেল টাউনে নির্মিত হচ্ছে ১২ তলা ১৪ তলার সুউচ্চ অট্টালিকা। সূত্রমতে জানা যায় যেগুলোর বেশির ভাগেরই রাজউকের কোনরকম অনুমোদন নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কেবলমাত্র আবেদন করেই নির্মাণ করা হচ্ছে এ সকল ভবন। এমনকি অধিকাংশ ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে কোন রকম নিরাপত্তা বেষ্টনীও দেওয়া হচ্ছে না। সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে এমনই চিত্র দেখা যায়। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে চন্দ্রিমা মডেল টাউনে এক নম্বর রোডে ১২ নম্বর বাড়ি নির্মাণ করছে আরবান গ্রীন হাউজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান। ভবনটির চতুর্থ তলার কাজ চলমান। রাজউকের কোনরকম অনুমোদনের সাইনবোর্ড না টানিয়ে নির্মিত হচ্ছে ভবনটি যেখানে সাউথ প্যালেস নাম দিয়ে ভবন নির্মাণের ডিজাইনে দেখানো হয়েছে ভবনটি ১২ তলা করা হবে। এ বিষয়ে কথা বলতে বিজ্ঞাপনে দেওয়া মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে কেউ ফোন রিসিভ করেননি। রাজধানী হাউজিং ৪০ ফুট রোড মোহাম্মদপুরে দেখা মেলে একটি ভিন্ন চিত্রের, সেখানে রাজউকে একটি আবেদন পত্র জমা দিয়েই নির্মাণ করা হচ্ছে বিশাল ভবন। ইতিমধ্যেই ছয় তলা নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলেছে। যেখানে ভবনের সামনে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাজউকের আবেদন নম্বর এ-০০৪৮৮.২৫.১১১.৩৫.১০১ উল্লেখ করা হয়েছে। আবেদনের তারিখ হিসেবে দেখানো হয় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫। এ বিষয়ে কথা বলতে ছোট্ট সাইনবোর্ডে দেওয়া মোবাইল নাম্বারে যোগাযোগ করলে তৌহিদ নামের একজন জানান তারা আবেদন করেই ভবন নির্মাণ করে চলেছেন, তাদের অনুমোদন নেই।একই চিত্র দেখা যায় বসিলার গার্ডেন সিটিতে ও, সেখানে এ ব্লকে ৪/১ নম্বর বাড়িটি নির্মিত হচ্ছে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ডে আবেদন নম্বর ও তারিখ উল্লেখ করে। উল্লেখিত আবেদন নম্বর এ-০০৫৮৭.২৫.১১১.৩৫.১০১, তারিখ ১৫ ই নভেম্বর ২০২৫। ইতিমধ্যে ভবনটির তৃতীয় তলার কাজ চলমান।
এখন প্রশ্ন হল শুধুমাত্র আবেদন করেই কি ভবন নির্মাণ সম্ভব? এ বিষয়ে জানতে রাজউকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে কথা বললে নাম না প্রকাশ করা শর্তে তিনি জানান রাজউকের আওতাধীন যে কোনো জোনে ভবন নির্মাণের অনুমতি না নিয়ে শুধুমাত্র আবেদন করেই ভবন নির্মাণের কোন সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মকাণ্ড রাজউকের নিয়ম বহির্ভূত। তিনি আরো বলেন কোন এলাকা কতটুকু ভূমিকম্প সহনশীল, সেখানে কতটুকু ফার প্রয়োজন, ভবনটি কতটুকু উচ্চতা পেতে পারে এসবের সুনির্দিষ্ট গাইড লাইনের বাইরে ভবন নির্মাণ করা হলে এটি মূলত বসবাসের জন্য পরিপূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নাও হতে পারে। একই সাথে ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান ড্যাপ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও সেটি প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে।
এখনই এ সকল অনুমোদনহীন ভবন নির্মাণ কারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা না নিলে নিরাপদ আবাসনের ক্ষেত্রে মানুষগুলো যেমন ঝুঁকিতে থাকবে, তেমনি রাজধানীকে একটি সুপরিকল্পিত নগর হিসেবে গড়ে তুলতে রাজউকের প্রচেষ্টা ও চরমভাবে ব্যাহত হবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের অতিমত।
মন্তব্য করুন