আমাদের বসুন্ধরা প্রতিবেদক : আইনজীবী সমিতির নির্বাচন মানে শুধু একটা পেশাদার সংগঠনের কমিটি বানানো নয়। এটা আদালতপাড়ার আয়না। এখানে যা ঘটে, তার প্রতিফলন পড়ে সাধারণ মানুষের বিচারপ্রাপ্তির আশায়। তাই যখন ঢাকা আইনজীবী সমিতির (ঢাকা বার) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একজন নারী আইনজীবীকে সকাল থেকে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত বসিয়ে রেখে মনোনয়নপত্র না দেওয়া হয়, তখন শুধু একটা প্রার্থীর হয়রানি হয় না গোটা পেশার মুখে কালি পড়ে।
গত মঙ্গলবার মোসাম্মৎ মৌসুমী বেগম ডাকুয়ার ঘটনাটি স্রেফ একটা ব্যতিক্রম নয়, এটা একটা প্যাটার্ন। তিনি ব্যাংকে পাঁচ হাজার টাকা জমা দিয়েছেন, নিয়ম মেনেছেন, কিন্তু ফরম চাইলে বলা হয় ‘সভাপতির আগাম অনুমতি লাগবে’। এমন নজিরবিহীন শর্ত আগে কখনো শোনা যায়নি। আওয়ামী লীগ-সমর্থিত প্যানেল নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিএনপি-জামায়াতপন্থী নীল প্যানেলের একক আধিপত্যের সুবিধা নিয়ে এই ‘অদ্ভুত নিয়ম’ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠছে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এখন ‘দ্বিতীয় শ্রেণির’ নাগরিক হয়ে গেছেন।
একটু ভেবে দেখুন। আইনজীবীরা যারা প্রতিদিন আদালতে দাঁড়িয়ে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আউড়ে বলেন “সকল নাগরিক সমান”, তারাই যখন নিজেদের নির্বাচনে একজন সদস্যকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসিয়ে রেখে বলেন, “সভাপতির অনুমতি ছাড়া ফরম নেই”, তখন সেটা শুধু হাস্যকর নয়, ভয়ংকরও বটে। মৌসুমী বেগমকে অনশনে বসতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিবাদের চাপে ফরম দেওয়া হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ক্ষতটা রয়ে গেছে। আদালতপাড়ায় এখন চাপা ক্ষোভ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক আইনজীবী বলছেন, “আওয়ামী লীগ নেই বলে কি স্বতন্ত্ররাও নির্বাচন করতে পারবে না?”
এখানে প্রশ্নটা রাজনৈতিক নয়, পেশাগত। বার অ্যাসোসিয়েশন কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা নয়। এটা আইনজীবীদের স্বাধীন সংগঠন। এখানে যদি এক প্যানেলের লোকেরা মনোনয়নপত্র সংগ্রহের পথেই বাধা তৈরি করে, তাহলে নির্বাচনের পর যে কমিটি আসবে, তার বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। আর যে সমিতি স্বয়ং গণতন্ত্রের চর্চা করতে পারে না, সে কীভাবে দেশের গণতন্ত্রের পাহারাদার হবে?
আমরা যারা আদালতে যাই, আমরা জানি আইনজীবীরা যখন একত্রিত হয়, তখন তাদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকবেই। কিন্তু সেই মতপার্থক্যকে সম্মান করার সংস্কৃতিই গণতন্ত্র। আজ যদি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হয়রানি করা হয়, কাল যদি কোনো নতুন মতের উদয় হলে তাকেও একইভাবে দমিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে পুরো প্রক্রিয়াটাই একতরফা হয়ে যায়। আর একতরফা নির্বাচনের ফলাফল যতই ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়’ হোক, তা কখনোই আইনজীবী সমাজের জন্য গর্বের বিষয় হতে পারে না।
ঢাকা বার নির্বাচন ২৯-৩০ এপ্রিল। এখনো সময় আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, বারের সভাপতি এবং সাধারণ আইনজীবীরা সবাই মিলে নিশ্চিত করুন যে কোনো প্রার্থীকে আর মনোনয়নপত্রের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে না হয়। কোনো ‘অদ্ভুত শর্ত’ যেন আর কাউকে হয়রানি না করে। কারণ এটা শুধু ঢাকা বারের নির্বাচন নয়। এটা একটা বার্তা আইনজীবীরা নিজেরা যদি গণতন্ত্রের চর্চা না করেন, তাহলে দেশের মানুষ কার কাছে আশা করবে?
মৌসুমী বেগমের অনশন শেষ হয়েছে। কিন্তু আইনজীবী সমাজের গণতান্ত্রিক চেতনার অনশন যেন না শুরু হয়। সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।