নাশিউল ইসলাম, সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট: দেশের নগর পরিবহন ব্যবস্থায় অটোরিকশা একসময় ছিল স্বস্তির প্রতীক। ব্যস্ত নগরজীবনে দ্রুত এবং তুলনামূলক সহজলভ্য এই যানটি মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য হয়ে উঠেছিল ভরসার নাম। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই অটোরিকশাই এখন অনেকের কাছে যেন ‘গলার কাটা’। ভাড়া নিয়ে অনিয়ম, চালকদের ইচ্ছামতো আচরণ, যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের অভাবে এই খাতটি এখন চরম বিশৃঙ্খলার মধ্যে পড়েছে। ফলে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ নিত্যযাত্রায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বড় শহরে অটোরিকশার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। গণপরিবহনের সংকট, যানজট এবং সময়ের অভাবে মানুষ দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য অটোরিকশার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই নির্ভরশীলতাই যেন এখন সাধারণ মানুষের জন্য এক ধরনের বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়েছে। কারণ, বিকল্প না থাকায় যাত্রীদের অনেক সময় অযৌক্তিক ভাড়া দিয়েই গন্তব্যে যেতে হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় অভিযোগ মিটার ব্যবহারে অনীহা। সরকার নির্ধারিত মিটার থাকা সত্ত্বেও অধিকাংশ চালক তা ব্যবহার করতে চান না। যাত্রী গন্তব্য বললেই চালক প্রথমে ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি শুরু করেন। অনেক সময় দেখা যায়, একই দূরত্বের জন্য ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভাড়া তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়ে যায়। বিশেষ করে অফিস সময়, বৃষ্টি বা যানজটের সময় এই সমস্যা আরও প্রকট হয়ে ওঠে। এতে করে সাধারণ মানুষ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
যাত্রীদের অভিযোগ, অটোরিকশা চালকদের একটি বড় অংশ গন্তব্য শুনেই যাত্রী নিতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা এমন গন্তব্য পছন্দ করে, যেখানে সহজে বেশি ভাড়া পাওয়া যায় বা যেখানে যানজট কম। ফলে অনেক সময় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি এবং শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যদিকে, মাঝপথে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার ঘটনাও কম নয়। বেশি ভাড়া পাওয়া যাবে এমন নতুন যাত্রী পেলে চালকরা পূর্বের যাত্রীকে মাঝপথেই নামিয়ে দেন এমন অভিযোগও রয়েছে। এতে যাত্রীদের শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, সময় নষ্ট এবং মানসিক চাপও তৈরি হয়।
এই খাতে নিয়ন্ত্রণের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি দুর্বল হওয়ায় চালকদের অনিয়ম বন্ধ করা যাচ্ছে না। নিয়মিত অভিযান বা জরিমানার কার্যক্রম থাকলেও তা খুবই সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর নয়। ফলে চালকদের মধ্যে আইন মানার প্রবণতা কমে গেছে।
অটোরিকশা চালকদের দিক থেকেও রয়েছে কিছু বাস্তবতা। তারা দাবি করেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, গাড়ির যন্ত্রাংশের মূল্য বৃদ্ধি এবং মালিককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা জমা দেওয়ার চাপ তাদের ওপর রয়েছে। ফলে নির্ধারিত ভাড়ায় চলা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক চালক ভাড়া বাড়ানোর পেছনে এই কারণগুলো তুলে ধরেন।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সমস্যার মূল কারণ হলো সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাব। একটি খাত তখনই বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে, যখন সেখানে কার্যকর নীতিমালা এবং তার বাস্তবায়ন থাকে না। অটোরিকশা খাতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। নিয়ম থাকলেও তার প্রয়োগ নেই, আর প্রয়োগ না থাকলে আইন কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অটোরিকশা খাতকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে হলে প্রথমেই মিটার ব্যবহারের বিষয়টি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে যাত্রীদের অভিযোগ গ্রহণ ও দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে অনলাইন অভিযোগ বা মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
এছাড়া চালকদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি। অনেক চালকই যাত্রীদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে, তা সম্পর্কে সচেতন নন। তাদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা গেলে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।
আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থাও উন্নত করতে হবে। যদি মানুষ সহজে গণপরিবহন ব্যবহার করতে পারে, তাহলে অটোরিকশার ওপর নির্ভরতা কমবে। এতে করে চালকদের একচেটিয়া আধিপত্যও কমে আসবে।
নারী যাত্রীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক নারী যাত্রী অভিযোগ করেন, তারা প্রায়ই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে নারী চালক সংখ্যা বাড়ানো বা বিশেষ সেবা চালু করা যেতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও এই খাত গুরুত্বপূর্ণ। হাজার হাজার মানুষ অটোরিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাই তাদের স্বার্থও বিবেচনায় রাখতে হবে। ভাড়া কাঠামো এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে চালকরা ন্যায্য আয় পান এবং যাত্রীরাও অতিরিক্ত ভাড়া দিতে বাধ্য না হন।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, এই খাতকে দ্রুত শৃঙ্খলার মধ্যে আনা হবে। প্রতিদিনের যাতায়াত যেন দুর্ভোগের কারণ না হয়ে স্বস্তির হয় এটাই সবার কামনা। অটোরিকশা যেন আবারও মানুষের ভরসার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে, সেই লক্ষ্যেই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
বর্তমান বাস্তবতায় অটোরিকশা সত্যিই অনেকের জন্য ‘গলার কাটা’ হয়ে উঠেছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের আন্তরিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করা সম্ভব। এখন শুধু প্রয়োজন সঠিক উদ্যোগ এবং তার বাস্তবায়ন।
মন্তব্য করুন