হেলাল আহমেদ : ৫ই আগস্ট ২০২৪; ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম। রাজপথের সেই উত্তাল দিনগুলোতে সাধারণ মানুষের একটাই চাওয়া ছিল-একটি বৈষম্যহীন, শোষণমুক্ত এবং ‘মব-কালচার’ মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজ। আমরা ভেবেছিলাম, পেশিশক্তি আর দখলদারিত্বের অন্ধকার অধ্যায় বুঝি চিরতরে শেষ হতে চলেছে। সাধারণ জনতা বুক বেঁধেছিল সত্যিকারের গণতন্ত্রের সুফল পাওয়ার আশায়। কিন্তু বর্তমানের কিছু চিত্র দেখে সত্যিই লজ্জায় মাথা নত হয়ে যায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ সেই প্রত্যাশার গায়ে কালিমা লেপন করছে কিছু মানুষের নোংরা রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষ ও চাঁদাবাজি।
একটি জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিকতা আজ কত গভীর খাদে তলিয়ে গেছে, তা বোঝা যায় যখন দেখি ডা. কামরুল ইসলামের মতো একজন ‘মানবিক ডাক্তার’ চাঁদাবাজদের লক্ষ্যবস্তু হন। যিনি বছরের পর বছর নিজের মেধা ও শ্রম বিলিয়ে দিয়ে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দুই হাজারেরও বেশি মানুষের দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন, সেই মহান ব্যক্তিত্বের হাসপাতাল যখন রাজনৈতিক পরিচয়ে হুমকির মুখে পড়ে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না-এই সমাজ কোন দ
[৪/১২, ৩:০৬ চগ] ঐরষধষ অযসধফ (এড়ঢ়ধষমধহল উরংঃৎরপঃ ঈড়ৎৎবংঢ়ড়হফবহঃ): একটি জাতি হিসেবে আমাদের নৈতিকতা আজ কত গভীর খাদে তলিয়ে গেছে, তা বোঝা যায় যখন দেখি ডা. কামরুল ইসলামের মতো একজন ‘মানবিক ডাক্তার’ চাঁদাবাজদের লক্ষ্যবস্তু হন। যিনি বছরের পর বছর নিজের মেধা ও শ্রম বিলিয়ে দিয়ে কোনো পারিশ্রমিক ছাড়াই দুই হাজারেরও বেশি মানুষের দেহে কিডনি প্রতিস্থাপন করেছেন, সেই মহান ব্যক্তিত্বের হাসপাতাল যখন রাজনৈতিক পরিচয়ে হুমকির মুখে পড়ে, তখন বুঝতে বাকি থাকে না-এই সমাজ কোন দিকে এগোচ্ছে। একজন মানুষ যখন নিজের জীবন উৎসর্গ করেন অপরের জীবন বাঁচাতে, আর কিছু মানুষ সেই সেবাকে পুঁজি করে পকেট ভরতে চায়, তখন সেই রাজনীতি তার আদর্শ হারিয়েছে, হারিয়েছে ন্যূনতম মানবতাও।
আজ যারা দলের নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজি বা দখলদারিত্বে লিপ্ত, তাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ আজ এমন ঘটনাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। একটি রাজনৈতিক দল তখনই ধ্বংসের দিকে এগোয়, যখন তাদের ভেতরে নৈতিকতার মৃত্যু ঘটে। চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব আর অপকর্ম কখনোই জনগণের সমর্থন এনে দিতে পারে না; বরং সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণা আর প্রত্যাখ্যানই বাড়ায়। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যারা আজ মানবিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে, তারা মূলত নিজেদের দলেরই কবর খুঁড়ছে।
এই সংকটের শেকড় আরও গভীরে। ৫ই আগস্টের পর থেকে আমরা যা দেখছি, তা যেন এদেশকে ‘মেধাশূন্য’ করার এক সুদূরপ্রসারী নীল নকশার অংশ। আজ শিক্ষাঙ্গনগুলোর দিকে তাকালে এক ভয়াবহ হাহাকার চোখে পড়ে। ছাত্ররা এখনও স্বাভাবিকভাবে ক্লাসে ফিরছে না, পাঠদানে নেই কোনো মনোনিবেশ। স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়- সর্বত্রই পড়াশোনার প্রতি এক চরম অনীহা। শিক্ষকদের সেই চিরচেনা মর্যাদা আজ ধূলিসাৎ; বরং চারিদিকে ‘মব’ সৃষ্টি করে নামমাত্র মূল্যায়নে বা অটো-পাশের এক অসুস্থ ধান্দা কাজ করছে ছাত্রদের একটি অংশের মধ্যে। অন্যদিকে, শিক্ষকরাও আজ কোণঠাসা। যে আগ্রহ ও প্রাণশক্তি নিয়ে তারা আগে শেখাতেন, সম্মান হারানোর ভয়ে সেই মন আজ আর তারা পাচ্ছেন না।
সবচেয়ে আশঙ্কার কথা হলো- “যেখানে গুণীর কদর নেই, সেখানে গুণীর জন্ম হয় না।” আজ আমাদের দেশের মেধাবীরা কেন দেশ ছেড়ে যায়, বা যাচ্ছে, তা ডা. কামরুলদের মতো গুণী মানুষদের প্রতি এই আচরণ দেখলেই স্পষ্ট হয়। একজন মেধাবী মানুষ আর যাই হোক, অন্তত অসম্মান সয়ে কাজ করতে পারেন না। তারা যখন দেখেন নিজের নিঃস্বার্থ সেবামূলক কাজেও রাজনৈতিক স্বার্থান্বেষী মহলের থাবা বসছে, তখন তারা দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন।
আমরা যদি এখনই সচেতন না হই, তবে অচিরেই এ দেশ মেধাশূন্য হয়ে পড়বে। হয়তো নির্দিষ্ট কোনো স্বার্থান্বেষী মহল ঠিক এটিই চায়-এদেশ যেন মেধা আর যোগ্যতায় পিছিয়ে থাকে, যাতে তারা সহজেই নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখতে পারে। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন, মানুষ এখন সব বোঝে। মানবতার বিরুদ্ধে যারা দাঁড়ায়, তাদের জন্য জনগণের আদালতে কোনো ক্ষমা নেই।
সময় এসেছে এই মব সংস্কৃতি আর রাজনৈতিক চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর, নয়তো একদিন এই জাতি শুধু মেধাহীন এক শূন্যতায় হাহাকার করবে।
মন্তব্য করুন