নাশিউল ইসলাম, সিনিয়র করেসপনডেন্ট: বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আবারও উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে হাম রোগের সংক্রমণ। একসময় টিকাদান কর্মসূচির সফলতায় নিয়ন্ত্রণে থাকা এই সংক্রামক রোগটি সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানে অনীহা, সচেতনতার অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে গুজব ও ভুল তথ্যের কারণে হামের প্রকোপ বাড়ছে। ফলে শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও ঝুঁকি বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে সম্প্রতি হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল এবং শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, হামের ভাইরাস অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই আশপাশের অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো এই ভাইরাস কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত পরিবাহিত হয়, যা প্রতিরোধ না করলে মহামারির রূপ নিতে পারে।
হামের লক্ষণ সাধারণত শুরু হয় হালকা জ্বর, সর্দি, কাশি এবং চোখ লাল হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। এরপর মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ বা কপলিক স্পট দেখা যায়, যা এই রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ। কয়েকদিনের মধ্যে সারা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে, যা রোগটিকে দৃশ্যমান করে তোলে। তবে অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা ভেবে প্রথমদিকে রোগটি শনাক্ত করা সম্ভব হয় না, ফলে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম কোনো সাধারণ রোগ নয়; এটি মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া এবং মস্তিষ্কে সংক্রমণের মতো গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। এমনকি সঠিক চিকিৎসা না পেলে এই রোগ প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হামের কারণে শিশু মৃত্যুর হার এখনও উল্লেখযোগ্য।
বাংলাদেশে ঊীঢ়ধহফবফ চৎড়মৎধসসব ড়হ ওসসঁহরুধঃরড়হ (ঊচও) কর্মসূচির আওতায় শিশুদের নিয়মিত টিকা দেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কিছু শিশু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টিকা পাচ্ছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদানের এই ফাঁকফোকরই হামের বিস্তারের অন্যতম কারণ। এছাড়া করোনাভাইরাস মহামারির সময় টিকাদান কার্যক্রমে যে ব্যাঘাত ঘটেছিল, তার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। অনেক পরিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যেতে অনীহা প্রকাশ করায় শিশুরা সময়মতো টিকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামের প্রকোপ মোকাবিলায় নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকা। গজ (গবধংষবং-জঁনবষষধ) টিকা শিশুদের নির্ধারিত বয়সে দিলে এই রোগ থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। একাধিক ডোজ টিকা গ্রহণ করলে প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পায়। তাই কোনোভাবেই টিকাদান অবহেলা করা উচিত নয়।
এছাড়া আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন আক্রান্ত ব্যক্তি লক্ষণ প্রকাশের আগেও অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে। তাই পরিবারের কেউ আক্রান্ত হলে তাকে আলাদা ঘরে রাখা, ব্যবহার্য জিনিসপত্র আলাদা রাখা এবং শিশুদের দূরে রাখা জরুরি। এতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও হাম প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া, হাঁচি-কাশির সময় মুখ ঢেকে রাখা এবং বাসা পরিষ্কার রাখা—এসব অভ্যাস রোগ প্রতিরোধে সহায়ক। বিশেষ করে স্কুলগামী শিশুদের মধ্যে এই অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি।
পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। ভিটামিন ‘এ’ সমৃদ্ধ খাবার যেমন গাজর, শাকসবজি, ডিম এবং দুধ শিশুদের জন্য অত্যন্ত উপকারী। চিকিৎসকরা অনেক সময় হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্ট দিয়ে থাকেন, যা রোগের জটিলতা কমাতে সাহায্য করে।
হামের লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাথমিক লক্ষণকে অবহেলা করে বাড়িতে বসে চিকিৎসা নেওয়ার চেষ্টা করা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। তাই জ্বর বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গুজব ও ভুল তথ্য হামের বিস্তারে বড় ভূমিকা রাখছে। অনেকেই টিকার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে ভীত হয়ে টিকা নিতে চান না, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে টিকা নিরাপদ এবং কার্যকর। তাই এই ধরনের ভুল ধারণা দূর করতে সমাজের সকল স্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও হামের বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। স্কুলে স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করে শিশুদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা যেতে পারে। একই সঙ্গে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বয়ে শিশুদের টিকাদান নিশ্চিত করা সম্ভব।
সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি সংস্থা ও সামাজিক সংগঠনগুলোও হামের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন। এতে করে টিকাদানের আওতা বৃদ্ধি পাবে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হবে।
বিশ্বব্যাপী হামের পুনরুত্থান জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এই রোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই টিকাদান, সচেতনতা এবং সময়মতো চিকিৎসা—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে হামের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।
সর্বোপরি, হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগ হলেও অবহেলার কারণে তা মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ—এই তিনটির সমন্বয়েই হামের প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এখনই সময় সতর্ক হওয়ার, নইলে এই পুরোনো রোগ নতুন করে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
মন্তব্য করুন