হেলাল আহমেদ: বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে যে আশঙ্কাটি দীর্ঘদিনের ছিল, তা শেষ পর্যন্ত বাস্তব রূপ নিল। তবে এবার বৃদ্ধির হার আগের মতো দু-এক টাকা নয়, বরং একে বলা চলে এক ভয়াবহ ‘প্রাইস শক’। রাতারাতি ডিজেলের দাম লিটারে ১১৫ টাকা, পেট্রল ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১৪০ টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জন্য আকাশ ভেঙে পড়ার মতো খবর [ সরকারের পক্ষ থেকে একে ‘বিশ্ববাজারের সাথে সমন্বয়’ বলা হলেও, বাস্তবে এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটার এক নিষ্ঠুর মহোৎসব কি ন-সেই প্রশ্ন এখন মুখে মুখে।
ইতিহাস সাক্ষী, অতীতে জ্বালানি তেলের দাম পাঁচ টাকা বাড়লেই রাজপথ উত্তপ্ত হতো, সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিবাদ জানাত। আজ সেই সহনশীলতার দেয়াল ভেঙে চুরমার করে এক ধাপে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে । প্রশ্ন হলো, এই অসহনীয় বোঝা মানুষ কতটা হজম করতে পারবে? এটি কি কেবল একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত, নাকি জনজীবনে নেমে আসা এক মহাদুর্যোগ?
জ্বালানির দাম বাড়লে তার চেইন রিঅ্যাকশন বা বহুমুখী প্রভাব সম্পর্কে আমরা সবাই জানি:
ডিজেলের দাম বাড়ার সাথে সাথেই বাস ও ট্রাক ভাড়া নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ইতোমধ্যে দীর্ঘ পাল্লার বাসে ভাড়া কিলোমিটার প্রতি অন্তত ২০-২২ শতাংশ বৃদ্ধির প্রস্তাবনা সামনে এসেছে
ট্রাক ভাড়া বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি পণ্যমূল্যে। আড়ত থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দাম বাড়বে কয়েক গুণ ।
সেচ কাজে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে চাষাবাদ ও ধান উৎপাদনের খরচ বাড়বে, যা খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গত মাসেই ইউরিয়া সারের দাম বাড়ানো হয়েছে, এখন জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।
সবচেয়ে বড় শঙ্কার জায়গা হলো-দাম বৃদ্ধির পরেও কি তেল পাওয়া যাবে? বাজারে তেলের কৃত্রিম সংকট এবং পাম্পগুলোতে দীর্ঘ লাইন আমাদের সেই শঙ্কাকেই আরও উসকে দিচ্ছে । মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা বা ইরান যুদ্ধের অজুহাত দিয়ে কতদিন সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে ভাববার সময় এসেছে
সরকার যখন বলে যে তারা ভর্তুকি কমাতে বাধ্য হয়েছে, তখন প্রশ্ন জাগে-মানুষের জীবনযাত্রার ওপর এই যে কর্কশ আঘাত, তার ক্ষতিপূরণ কে দেবে? মুদ্রাস্ফীতির কষাঘাতে জর্জরিত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং বেঁচে থাকার লড়াইকে আরও কঠিন করে তোলার নামান্তর । অবিলম্বে এই গণবিরোধী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা এবং তদারকি জোরদার করা না হলে জনজীবনে যে অস্থিরতা তৈরি হবে, তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে। জ্বালানি তেলের এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। এখন যদি অসাধু সিন্ডিকেট দমন করা না যায়, তবে এই অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। জনস্বার্থ রক্ষায় এবং বাজারের স্থিতিশীলতা ফেরাতে শূন্য সহনশীলতা (Zero Tolerance) নীতি বজায় রাখাই হোক বর্তমান সময়ের প্রধান অঙ্গীকার।