হেলাল আহমেদ: স্বাস্থ্যসেবা যখন মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার স্লোগান দেওয়া হয়, তখন গোপালগঞ্জ থেকে আসা খবরগুলো আমাদের শঙ্কিত করে। একদিকে জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংক্রামক ব্যাধি হামের প্রকোপ, অন্যদিকে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোতে তৈরি হয়েছে এক দমবন্ধ পরিবেশ। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত জেলায় হামে সন্দেহভাজন আক্রান্তের সংখ্যা ৩৩৬ জন ছাড়িয়েছে, যার সিংহভাগই শিশু।
হামে আক্রান্ত শিশুর শরীর যখন তীব্র জ্বরে পুড়ে যায়, তখন তার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বাতাস ও শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। কিন্তু গোপালগঞ্জের হাসপাতালগুলোতে চিত্রটা ভিন্ন। দিন নেই, রাত নেই-তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে অক্সিজেন সেবা ও জরুরি নেবুলাইজেশন কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হচ্ছে। যখন একটি শিশুর জীবন বিপন্ন, তখন টেকনিক্যাল অজুহাত কোনো সমাধান হতে পারে না।
এই সংকট নিরসনে গোপালগঞ্জের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, হামের প্রকোপ সামাল দিতে তারা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন এবং আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিশেষ ইউনিটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন যে, ঘন ঘন লোডশেডিং শিশুদের শারীরিক অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা পরোক্ষভাবে চিকিৎসার গতিকে মন্থর করছে। সিভিল সার্জন অফিস থেকে বিষয়টি বিদ্যুৎ বিভাগকে জানানো হয়েছে যাতে অন্তত হাসপাতাল এলাকায় লোডশেডিং কমিয়ে আনা যায়।
অন্যদিকে, বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে জানিয়েছেন যে, চাহিদার তুলনায় জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ কম থাকায় সারা জেলাতেই রেশনিং বা লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তবে হাসপাতালের গুরুত্ব বিবেচনা করে একটি বিশেষ ফিডারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে তিনি দাবি করেন।
কর্তৃপক্ষের এই ‘চেষ্টা চলছে’ বা ‘সীমাবদ্ধতা’র তত্ত্বে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না ভুক্তভোগী অভিভাবকেরা। হাম একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। সঠিক পরিবেশের অভাবে আক্রান্ত শিশুরা নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদী জটিলতায় পড়তে পারে। এমতাবস্থায় বিদ্যুৎ বিভাগের এমন উদাসীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়। হাসপাতালের মতো জরুরি সেবা কেন্দ্রগুলোকে কেন শতভাগ ‘নো লোডশেডিং’ জোনের আওতায় রাখা হবে না, সেই প্রশ্ন আজ জনমনে তীব্র হয়ে দেখা দিয়েছে।
আমরা একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে স্মার্ট বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি। কিন্তু একটি জেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রে বিদ্যুতের অভাবে শিশুরা ধুঁকবে-এটা কোনোভাবেই মানা যায় না। রাষ্ট্রের কাছে আকুল আবেদন, শিশুদের জীবন নিয়ে এই অনিশ্চয়তা বন্ধ করুন। হাম মোকাবিলায় টিকাদান কর্মসূচি আরও জোরদার করার পাশাপাশি অবিলম্বে হাসপাতালগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। কর্তৃপক্ষ কি এই আর্তনাদ শুনবেন?
মন্তব্য করুন