সাখাওয়াত হোসেন শরীফ, সিংগাপুর:আমি সাখাওয়াত হোসেন শরীফ। সিংগাপুর প্রবাসী একজন কর্মী হিসেবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্ত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছি। দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে কিছু বাস্তবধর্মী প্রস্তাবনা তুলে ধরছি, যা বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবাসী কল্যাণের পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
১. প্রবাসীদের জন্য পেনশন ব্যবস্থা চালু করা।
বর্তমানে সরকার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ২.৫% প্রণোদনা প্রদান করছে, যা সরাসরি দেশে প্রেরিত অর্থের সঙ্গে যুক্ত হয়। এই প্রণোদনার একটি অংশ—ধরা যাক ২%—সংরক্ষণ করে, সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত ১-২% যোগ করে একটি দীর্ঘমেয়াদি পেনশন স্কিম চালু করা যেতে পারে।
এতে করে প্রবাসীরা তাদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সম্পর্কে আশ্বস্ত হবে। যে ব্যক্তি যত বেশি বছর প্রবাসে থাকবে এবং যত বেশি রেমিট্যান্স পাঠাবে, তার পেনশন তত বেশি হবে এমন একটি কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব।
এই স্কিম পরিচালনার জন্য একটি ইউনিক আইডি (যেমন: ঘওউ ভিত্তিক) ব্যবহার করা যেতে পারে, যাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়।
উল্লেখ্য, অতীতে প্রবাসীদের মূল পাঠানো অর্থ থেকে কেটে নেওয়ার প্রস্তাব ছিল, যা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং হুন্ডি ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করে। তাই ভবিষ্যতের যে কোনো পরিকল্পনা হতে হবে প্রণোদনাভিত্তিক, কর্তনভিত্তিক নয়।
১. ডাউন পেমেন্ট ছাড়া সরকারি প্লট সুবিধা
প্রবাসীদের জন্য “ভাড়ার টাকায় মালিকানা” মডেলে সরকারি প্লট বা ফ্ল্যাট দেওয়ার একটি ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। এতে করে একজন প্রবাসী মাসিক কিস্তির মাধ্যমে ধীরে ধীরে সম্পত্তির মালিক হতে পারবেন।
শর্ত হিসেবে রাখা যেতে পারে—
* নিয়মিত বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণ
* নির্দিষ্ট সময়কাল ধরে অর্থ প্রেরণের ধারাবাহিকতা
* পেনশন থেকে একটা ডাউন পেমেন্ট দিয়ে শুরু করা যেতে পারে ।
এ ধরনের উদ্যোগ প্রবাসীদের বৈধ পথে অর্থ পাঠাতে উৎসাহিত করবে, ফলে রেমিট্যান্স প্রবাহও বৃদ্ধি পাবে।
১. এ২এ চুক্তির আওতায় “প্রবলেম সলভ ইউনিট” তৈরি করা ।
প্রতিটি প্রবাসী শ্রমবাজারে সরকারিভাবে (এ২এ) চুক্তির মাধ্যমে একটি আলাদা “প্রবলেম সলভ ইউনিট” গঠন করা জরুরি।
বাস্তবতা হলো অনেক প্রবাসীরই নিজ দেশের দূতাবাসের প্রতি আস্থা নেই। অনেক ক্ষেত্রে সম্পর্কটা সহযোগিতামূলক না হয়ে কর্তৃত্বমূলক হয়ে দাঁড়ায়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য দরকার
* স্বতন্ত্র ও জবাবদিহিমূলক সমস্যা সমাধান ইউনিট
* দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা
* প্রবাসীবান্ধব আচরণ ও সেবা মান নিশ্চিতকরণ
১. রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ
শুধু গ্রেডিং সিস্টেম চালু করলে তা দুর্নীতির কারণে অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এর পরিবর্তে একটি শক্তিশালী রেগুলেটরি কমিশনের আওতায় সব এজেন্সিকে আনা উচিত।
এই কমিশনের অধীনে
* স্বয়ংক্রিয় (অঁঃড়সধঃবফ) মনিটরিং সিস্টেম চালু করা
* প্রতিটি লেনদেন ও কার্যক্রম ডিজিটালি ট্র্যাক করা
* এজেন্সির পারফরম্যান্স নিয়মিত মূল্যায়ন করা
এছাড়া প্রতিটি এজেন্সিকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের মাধ্যমে প্রেরিত প্রবাসীদের অন্তত ২-৩ বছর পর্যন্ত দেখভালের দায়িত্ব নিতে হবে। এই বিষয়টি নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
প্রবাসীরা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের জন্য বাস্তবমুখী, স্বচ্ছ ও কল্যাণমুখী নীতিমালা গ্রহণ করা হলে শুধু প্রবাসীদের জীবনমানই উন্নত হবে না, বরং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহও বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। এখন সময় এসেছে বাসীদের শুধুমাত্র রেমিট্যান্স প্রেরক হিসেবে নয়, বরং উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করার।
মন্তব্য করুন