দেশের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে নিতে সিরাজগঞ্জে তাঁত কারখানায় সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর মাধ্যমে একদিকে যেমন তাঁত উদ্যোক্তাদের বিদ্যুৎ ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্য দিকে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে জলবায়ূ পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবেলাও ভূমিকা রাখার চেষ্টা চলছে।
ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (এনডিপি) দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন যাত্রার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে দেশের ২০ টি জেলায় ৪০ টির বেশি প্রকল্প ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। জলবায়ূ পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ জলবায়ূ সহিষ্ণু করে গড়ে তুলতে এসব উদ্যোগের পাশাপাশি সিরাজগঞ্জের তাঁত শিল্পের উন্নয়নেও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব ব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এর আর্থিক ও কারিগরী সহায়তায় সিরাজগঞ্জের তাঁতীদের জলবায়ূ পরিবর্তন জনিত অভিঘাত মোকাবেলার সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘‘Resource Efficient Cleaner Production (RECP) নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ‘‘Promoting Green Growth in Loom Sub-sector By Resource Efficient Practices” প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে।
প্রকল্পটি সিরাজগঞ্জ জেলার তাঁত অধ্যুষিত পাঁচটি উপজেলা-সিরাজগঞ্জ সদর, কামারখন্দ, বেলকুচি, চেহৈালী ও শাহজাদপুর- এর ১ হাজার ৫ শত তাঁত উদ্যোক্তাকে নিয়ে কাজ করছে। সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার ও পরিচ্ছন্ন উৎপাদন নিশ্চিত করা, পরিবেশসম্মত বৈচিত্র্যময় পণ্য উৎপাদনে উদ্যোক্তাদের কারিগরী জ্ঞান ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তির ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং মাঠ পর্যায়ে চক্রাকার অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট কর্মকান্ড সম্প্রসারণ প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ।
প্রকল্পটির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হচ্ছে তাঁত কারখানায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবহারে উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা এবং ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে তাঁত কারখানাগুলোতে আর্থিক সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয় হয়েছে।
সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনে তাঁত উদ্যোক্তাদের উৎসাহী করতে প্রকল্পের আওতায় সৌর বিদ্যুতের সক্ষমতা অনুযায়ী নয় হাজার ছয়শত টাকা থেকে তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত তাঁতীদেরকে অনুদান দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পভূক্ত বেলকুচি, কামারখন্দ ও চৌহালী উপজেলায় ৩১ টি কারখানায় মোট ১০৪.৯ কিলোওয়াট সক্ষমতার সৌর বিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে।
প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত এসব সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় ৬,৫৯৪ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ সাশ্রয় হচ্ছে। এতে তাঁত উদ্যোক্তাদের প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হচ্ছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উদ্যোক্তারা পরিচ্ছন্ন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন।
প্রকল্পের আওতাধীন কারখানাগুলোতে ব্যাপকভাবে সৌর বিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ অব্যাহত আছে। প্রকল্পের মেয়াদে সংশ্লিষ্ট এলাকায় প্রায় ৫ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হলে তাঁত উদ্যোক্তাদের প্রতি মাসে প্রায় ১০ লক্ষ টাকা বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হতে পারে।
সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে শুধু তাাঁত উদ্যোক্তাদের জ্বালানি ব্যয় কমবে না, জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তাতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আমাদের বিশ্বাস। একই সঙ্গে প্রকল্পের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে বছরে প্রায় ৩ হাজার ৩০৫ টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে। ফলে সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁত শিল্পে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি জলবায়ূ পরিবর্তন মোকাবেলায়ও এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সৌর বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং এর পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকারি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, দপ্তর ও অধিদপ্তরের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে সৌর বিদ্যুৎ থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করার প্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও সহজ করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
তাঁত শিল্পে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোগেলে উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি শিল্পটির পরিবেশগত স্থায়িত্বও বাড়বে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে জ্বালানি নিরাপত্তা, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং সবুজ অর্থনীতির বিকাশে এ ধরনের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
মন্তব্য করুন