শীলা প্রামাণিক : বর্তমান যুগে শিক্ষার গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পক্ষান্তরে পিতা-মাতা নিজেদের অপূর্ণতা বা ব্যর্থতা পূরণের মেশিন হিসেবেও অনেক সময় সন্তানকে ব্যবহার করে। আবার বর্তমান যুগের সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে ফলাফল প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা এবং একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ার আশায় অভিভাবকরা সন্তানদের ওপর অনেক সময় অতিরিক্ত পড়াশোনার বোঝা চাপিয়ে দিয়ে থাকে। কিন্তু এই অতিরিক্ত চাপ শিশুদের জন্য আশীর্বাদ না হয়ে বরং অভিশাপে পরিণত হতে পারে। এটি তাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে। অনেক সময় মানসিক বিকারগ্রস্ত রোগী হিসেবে পরিণত হতে পারে।
আমরা যদি উন্নত দেশগুলোর দিকে লক্ষ্য করি বিশেষ করে জাপানের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখা যাবে জাপানের শিক্ষাব্যবস্থা বিশ্বের অন্যতম শৃঙ্খলাপূর্ণ ও মানবিক হিসেবে পরিচিত। সেখানে শিক্ষার্থীদের শুধু বইয়ের জ্ঞানই নয়, বরং মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার উপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই কারণে জাপানের শিশুরা সাধারণত অহিংস, সহনশীল ও দায়িত্বশীল হয়ে ওঠে। অন্যদিকে, আমাদের সমাজে অনেক শিশু ধীরে ধীরে মানসিক বিকার, আগ্রাসন ও অস্থিরতার দিকে ঝুঁকছে—যা গভীরভাবে চিন্তার বিষয়।
জাপানে শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো নৈতিকতা ও সামাজিক মূল্যবোধ। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখানো হয়—সহানুভূতি, সম্মান, ধৈর্য ও আত্মনিয়ন্ত্রণ। সেখানে ‘মোরাল এডুকেশন’ বা নৈতিক শিক্ষা একটি বাধ্যতামূলক অংশ। শিশুরা স্কুলে নিজেরাই শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার করে, একসাথে খাবার পরিবেশন করে—এতে তাদের মধ্যে দায়িত্ববোধ ও সহযোগিতার মনোভাব গড়ে ওঠে। শিক্ষকরা শুধু পাঠদাতা নন, তারা আদর্শ মানুষ হিসেবে শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থিত হন।
জাপানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—শৃঙ্খলা ও নিয়ম মেনে চলার অভ্যাস। তারা শিশুদের ছোট থেকেই শেখায় কীভাবে নিজের আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয়। ফলে সহিংসতা বা আগ্রাসনের প্রবণতা খুব কম দেখা যায়।
সন্তানের সফলতা বা ব্যর্থতার পেছনে পিতা-মাতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অজান্তেই কিছু নেতিবাচক আচরণ সন্তানের মানসিক বিকাশ ও আত্মবিশ্বাসে প্রভাব ফেলে। তাই এসব দিক চিহ্নিত করে দূর করা জরুরি।
পিতা-মাতার কিছু নেতিবাচক ভূমিকা
পড়াশোনা বা ক্যারিয়ার নিয়ে অযথা চাপ প্রয়োগে সন্তান মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
এই মানসিক চাপের কিছু লক্ষণ রয়েছে— যা অভিভাবকদের খেয়াল করা উচিত। যেমন—শিশু হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যাওয়া, অল্পতেই রেগে যাওয়া, অকারণে কান্নাকাটি করা, পড়াশোনায় অনাগ্রহ সৃষ্টি হওয়া, ঘুমের সমস্যা, বা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকা। অনেক সময় তারা নিজের কষ্ট প্রকাশ করতে পারে না, ফলে ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়ে। যদি এসব লক্ষণ দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকে তবে তা গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
বেশিরভাগ পিতা মাতার মধ্যে অন্যদের সাথে তুলনা করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। বারবার তুলনা করলে আত্মবিশ্বাস কমে যায়।
সন্তানের কথা না শুনলে বা গুরুত্ব না দিলে সে একাকিত্ব অনুভব করে। কারণে-অকারণে সন্তানকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা অপমান করা সন্তানের মধ্যে হীনমন্যতা তৈরি হয়।
সন্তানের বিষয়ে সব সিদ্ধান্ত নিজেরা নিলে সন্তান নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা হারায়। সন্তানের যে-কোনো ভুলে কঠোর শাস্তি অকারণে ভীতি সৃষ্টি হয়, শেখার আগ্রহ কমে যায়।
এসব সমস্যা দূর করতে হলে পিতা-মাতাকে অধিক সহানুভূতিশীল হতে হবে এবং সন্তানের অনুভূতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে।
সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত খোলামেলা কথা বললে সম্পর্ক ভালো হয়।
প্রশংসা ও উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে ছোট ছোট সাফল্যকেও মূল্যায়ন করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে।
সন্তানকে নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
সন্তান ভুল করলে তাকে শাস্তির বদলে বোঝানো উচিত।
সন্তানের সফলতা শুধু তার নিজের নয়, পিতা-মাতার সঠিক দিকনির্দেশনার ফল। তাই নেতিবাচক আচরণ দূর করে ইতিবাচক সহানুভূতিশীল পরিবেশ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। এতে সন্তান মানসিকভাবে সুস্থ ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।
আমাদের দেশের অনেক শিশু আজ মানসিকভাবে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। এর পেছনে রয়েছে নানা কারণ। প্রথমত, অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ ও ফলাফলভিত্তিক প্রতিযোগিতা। বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশা শিশুদের মানসিকভাবে চাপে ফেলে দেয়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির অপব্যবহার—মোবাইল, গেম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত আসক্তি শিশুদের বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। তৃতীয়ত, পারিবারিক অস্থিরতা—ঝগড়া, অবহেলা বা সঠিক সময় না দেওয়া শিশুর মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এছাড়া নৈতিক শিক্ষার অভাবও একটি বড়ো কারণ। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার ফলকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু চরিত্র গঠন বা মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর দিকে তুলনামূলকভাবে কম নজর দেওয়া হয়। ফলে শিশুরা জ্ঞান অর্জন করলেও সঠিক আচরণ বা মূল্যবোধে পিছিয়ে পড়ে।
এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। প্রথমত, শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের সাথে সময় কাটানো, তাদের কথা শোনা ও মানসিকভাবে সমর্থন দেওয়া। তৃতীয়ত, প্রযুক্তি ব্যবহারে নিয়ন্ত্রণ আনা এবং শিশুদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করা। সর্বোপরি, পরিবার, স্কুল ও সমাজ—এই তিনটি স্তরের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিশুদের সুস্থ মানসিক বিকাশ নিশ্চিত করা সম্ভব।
পরিশেষে বলা যায়, জাপানের মতো উন্নত দেশগুলো আমাদের জন্য একটি আদর্শ হতে পারে। যদি আমরা তাদের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও মানবিকতার শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, তবে আমাদের শিশুরাও অহিংস, সুস্থ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে।
কাজেই সন্তানকে শুধু ভালো ছাত্র নয়, একজন সুস্থ, সুখী ও আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। একটু ভালোবাসা, সময় এবং সমর্থনই পারে শিশুর জীবন থেকে অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ দূর করে তাকে আত্মবিশ্বাসী ও আনন্দময় করে তুলতে। শিশুর মধ্যে সৃজনশীল মনোজগৎ তৈরি করতে মানসিক চাপ নয়, প্রয়োজন পর্যাপ্ত ইতিবাচক সমর্থন।
সহকারী অধ্যাপক
সিরাজগঞ্জ
০১৭১০৭৯৭৩১০