মো. গোলাম ফারুক মজনু লেখক ও গবেষক সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক বিপ্লবী জনতা। সভাপতি, সম্মিলিত সাংবাদিক পরিষদ এসএসপি।
২৬ অগাস্ট ২০২৬, ৩:২৭ অপরাহ্ন
অনলাইন সংস্করণ

একই পৃথিবী, অথচ কত ভিন্ন জীবন

একই আকাশের নিচে আমরা সবাই বাস করি, একই সূর্য আমাদের শরীরে আলো দেয়, একই রাত আমাদের ঘুম পাড়াতে আসে, তবু মানুষের জীবন কত অদ্ভুত ভাবে ভিন্ন! কেউ খাবারের সন্ধানে রাস্তায় রাস্তায় দৌড়াচ্ছে, আজ একটু কাজ মিলবে কি না, সেই চিন্তায় তার বুক কাঁপছে। কারণ আজ কাজ না পেলে হয়তো ঘরে চুলা জ্বলবে না, সন্তানের মুখে খাবার উঠবে না। আবার একই শহরের অন্য প্রান্তে কেউ অতিরিক্ত খাবার খেয়ে সেই খাবার হজম করার জন্য শরীরচর্চা করতে দৌড়াচ্ছে। একজনের কাছে একমুঠো ভাত বেঁচে থাকার স্বপ্ন, অন্য জনের কাছে খাবারের অতিরিক্ত ক্যালরি কমানোই চিন্তার বিষয়। কী আশ্চর্য এই পৃথিবী! একই শহর, একই বাতাস, একই সময়, অথচ মানুষের প্রয়োজন, প্রাপ্তি আর বেদনার ভাষা কত আলাদা। কেউ জীবনকে একটু ধরে রাখার জন্য যুদ্ধ করছে, আর কেউ জীবনকে আরেকটু আরামদায়ক করার জন্য যুদ্ধ করছে। অথচ দিনের শেষে দুজনকেই রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ভেতরের একাকিত্ব, ভয় আর অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হয়। জীবন আমাদের বারবার শেখায়, প্রাচুর্য আর তৃপ্তি এক জিনিস নয়, অভাব আর অসুখও সবসময় একই অর্থ বহন করে না।

গভীর রাতে যখন শহরের অধিকাংশ জানালার আলো নিভে যায়, তখন কোনো বিলাসবহুল গাড়ি হয়তো নীরবে গিয়ে থামে কোনো নিষিদ্ধ গলির সামনে। গাড়ির ভেতরের মানুষটির হয়তো ঘরে একজন স্ত্রী অপেক্ষা করছেন, সন্তান বাবার ফেরার অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়েছে, অথচ স্ত্রী জানেন না তাঁর অপেক্ষার মানুষটি কোথায় সময় কাটাচ্ছেন। হয়তো জানেন, কিন্তু কিছু বলেন না। কারণ সংসারের অনেক সত্য উচ্চারণ করা যায় না, কিছু সত্য কেবল বুকের ভেতর জমে থাকে। ঘড়ির কাঁটা যত এগোয়, অপেক্ষারত স্ত্রীর দীর্ঘশ্বাস তত ভারী হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর কান্না গুলোর অনেক গুলোরই কোনো শব্দ নেই। অথচ অন্যদিকে, কোনো ভাঙা ঘরের টিনের চালের নিচে স্বামী-স্ত্রী হয়তো পাশাপাশি বসে ভবিষ্যতের সুখের স্বপ্ন বুনছেন। তাদের ঘরে দামি আসবাপত্র নেই, ব্যাংকে বড় সঞ্চয় নেই, গাড়ি নেই, বিলাসিতা নেই। কিন্তু আছে একজন আরেক জনের প্রতি বিশ্বাস, আছে কষ্টের দিনে হাত ধরে থাকার প্রতিশ্রুতি। তারা হয়তো জানে আগামী কালও অভাব থাকবে, তবু তারা স্বপ্ন দেখে, একদিন নিজেদের একটা ঘর হবে, সন্তানের জন্য একটা ভালো ভবিষ্যৎ হবে, জীবনের কষ্টগুলো একদিন কমে যাবে। মানুষের জীবনে কখনো কখনো সবচেয়ে বড় সম্পদ টাকা নয়, একজন মানুষের পাশে আরেকজন মানুষের নিঃশর্ত উপস্থিতি। যে মানুষটি বলতে পারে, ‘সব হারালেও আমি তোমার পাশে আছি’, সে হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী মানুষ, যদিও তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে কোনো অর্থ নেই।

কেউ একটি সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতিদিন নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন। অভিমান, ভুল বোঝাবুঝি, অপমান, দূরত্ব, সবকিছুর পরও তিনি সম্পর্কটির হাত ছাড়তে পারছেন না। তিনি বারবার নিজের অহংকার ভেঙে বলেন, ‘আরেকবার চেষ্টা করি, হয়তো এবার সব ঠিক হবে।’ আবার এমন একজনও আছেন, যিনি ডিভোর্সের কাগজে সই করার অপেক্ষায় দিন গুনছেন। তাঁর কাছে সেই কাগজ হয়তো কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি নয়, বরং দীর্ঘদিনের মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির দরজা। একই শব্দ, সংসার, অথচ কারও কাছে সংসার আশ্রয়, কারও কাছে দায়িত্ব, কারও কাছে ভালোবাসার শেষ ঠিকানা, আবার কারও কাছে এমন এক কারাগার যেখান থেকে বেরিয়ে আসার জন্য মানুষ বছরের পর বছর অপেক্ষা করে। কেউ শুধু সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে সংসারটি চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজের কান্না লুকিয়ে সন্তানের সামনে হাসছেন, নিজের অপমান গিলে সন্তানের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। সন্তান হয়তো কোনো দিন জানবেই না, তার শৈশবের প্রতিটি হাসির পেছনে বাবা-মায়ের কত অশ্রু জমা ছিল। আবার এমন সংসারও আছে, যেখানে কোনো বড় ঝগড়া নেই, কোনো প্রকাশ্য বিচ্ছেদ নেই, অথচ দুজন মানুষ একই ছাদের নিচে থেকেও সম্পূর্ণ আলাদা জীবনযাপন করেন। তারা পাশাপাশি বসে খাবার খান, একই বিছানায় ঘুমান, একই পরিবারের পরিচয় বহন করেন, কিন্তু তাদের হৃদয়ের দরজাগুলো একে অপরের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে। বোঝাপড়ার অভাব কখনো কখনো বিচ্ছেদের চেয়েও ভয়ংকর। কারণ বিচ্ছেদে মানুষ অন্তত জানে সম্পর্কটি শেষ হয়েছে, কিন্তু পাশাপাশি থেকেও যখন সম্পর্কের মৃত্যু ঘটে, তখন মানুষ প্রতিদিন একটি মৃত সম্পর্কের ভেতর বেঁচে থাকে।

সন্তানের গল্পে পৃথিবীর বৈপরীত্য যেন আরও নির্মম হয়ে ওঠে। কেউ একটি সন্তানকে নিজের জীবনের বোঝা মনে করে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে মুক্তি পেতে চায়, কেউ অবহেলা আর নিষ্ঠুরতায় একটি শিশুর জীবনের অধিকার কেড়ে নেয়। অথচ পৃথিবীর অন্য কোনো ঘরে একজন মা-বাবা একটি সন্তানের জন্য সারাজীবন অপেক্ষা করছেন। একটি শিশুর কান্না শোনার আকাঙ্ক্ষায় কত রাত নির্ঘুম কেটে যায়, কত প্রার্থনায় হাত ওঠে, কত হাসপাতালের করিডোরে মানুষ আশার অপেক্ষায় বসে থাকে। কারও কাছে একটি সন্তান অনাকাঙ্ক্ষিত, আর কারও কাছে সেই সন্তানই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা। কেউ সন্তান জন্মের পর তাকে পৃথিবীর বোঝা মনে করে, আবার কেউ একটি সন্তানের জন্য নিজের সমস্ত সঞ্চয়, সময়, যৌবন, স্বপ্ন, সবকিছু বিসর্জন দিতে প্রস্তুত। এই বৈপরীত্য আমাদের শুধু কাঁদায় না, আমাদের বিবেকের কাছেও প্রশ্ন রাখে, একটি জীবনকে আমরা এত সহজে কীভাবে মূল্যহীন করে ফেলি? যে শিশুটির পৃথিবী বোঝার মতো বয়সও হয়নি, সে কীভাবে কারও কাছে বোঝা হয়ে যায়? অথচ সেই একই পৃথিবীতে কত মানুষ একটি শিশুর হাত ধরে হাঁটার স্বপ্ন নিয়েই জীবন পার করে দেন। হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা হলো, যে জিনিসটি একজন মানুষ অবহেলায় ফেলে দেয়, অন্য একজন মানুষ সেটিই পাওয়ার জন্য সারাজীবন প্রার্থনা করে।

কেউ বিয়ে নামের সম্পর্কটির সঙ্গে নিজেকে জড়াতে পারেননি। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, চারপাশে মানুষের সংসার হচ্ছে, সন্তান হচ্ছে, পরিবার বড় হচ্ছে, আর তিনি নিজের জন্য একজন সত্যিকারের মানুষের অপেক্ষায় আছেন। আবার কেউ জীবনে ভালোবাসা, বিশ্বাস আর সুন্দর একটি সম্পর্কের সুযোগ পেয়েও অবহেলা, অহংকার কিংবা ভুল সিদ্ধান্তের কারণে সেই মানুষটিকে হারিয়েছেন। মানুষ অনেক সময় যা কাছে পায়, তার মূল্য বুঝতে পারে না। আর যা হারিয়ে ফেলে, তার মূল্য বুঝতে বুঝতে জীবনের অনেকটা সময় পার হয়ে যায়। তখন মনে হয়, আরেকবার যদি সুযোগ পাওয়া যেত! কিন্তু জীবন সবসময় দ্বিতীয় সুযোগ দেয় না। কিছু মানুষ চলে যায়, কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, কিছু দরজা একবার বন্ধ হলে আর খোলে না। তখন মানুষ বুঝতে পারে, জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসগুলো আসলে টাকা দিয়ে কেনা যায় না। একজন মানুষের বিশ্বাস, একটি সম্পর্কের আন্তরিকতা, কারও নিঃস্বার্থ অপেক্ষা কিংবা ভালোবাসায় ভরা একটি হৃদয়, এসব হারিয়ে গেলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ দিয়েও ফিরিয়ে আনা যায় না। তাই জীবনে যা আছে, তার মূল্য বুঝতে হয় হারানোর আগে। কারণ কিছু হারানোর পর অনুশোচনা ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

খাবারের টেবিলও মানুষের জীবনের এই বৈপরীত্যের এক অসাধারণ প্রতিচ্ছবি। কেউ লাখ টাকার ডাইনিং টেবিলে বসে অসংখ্য পদের খাবারের সামনে থেকেও তৃপ্তি নিয়ে খেতে পারেন না। টেবিলে খাবারের অভাব নেই, কিন্তু ক্ষুধা নেই। চারপাশে মানুষের অভাব নেই, কিন্তু আপনজন নেই। ঘর বড়, কিন্তু হৃদয়ের ভেতরটা শূন্য। অন্যদিকে কোনো দরিদ্র ঘরে একজন মানুষ হয়তো একটি পেয়াজ, কয়েকটি কাঁচামরিচ আর পান্তা ভাত মেখে এমন তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছেন, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ভোজ তাঁর সামনে সাজানো। কারণ তৃপ্তি খাবারের দামে নয়, তৃপ্তি আসে ক্ষুধা থেকে। আর জীবনের তৃপ্তি শুধু সম্পদ থেকে আসে না, আসে শান্তি থেকে, ভালোবাসা থেকে, আপনজনের সান্নিধ্য থেকে। একটি ছোট ঘরে পাঁচজন মানুষ হয়তো এক থালা খাবার ভাগ করে খেয়ে হেসে উঠতে পারে, আর বিশাল প্রাসাদের একা মানুষটি পৃথিবীর সমস্ত খাবার সামনে পেয়েও নিজের একাকিত্ব গিলতে পারেন না। তখন প্রশ্ন জাগে, আসলে ধনী কে? যার ঘরে সবকিছু আছে, নাকি যার সামান্য আছে কিন্তু সেই সামান্যের মধ্যেই তৃপ্তি খুঁজে নেওয়ার ক্ষমতা আছে?

আমরা মানুষের জীবনকে কত সহজে বিচার করি! কারও দামি গাড়ি দেখে ভাবি, সে সুখী। কারও বড় বাড়ি দেখে মনে করি, তার জীবনে কোনো কষ্ট নেই। কারও সুন্দর পোশাক, বিদেশ ভ্রমণ কিংবা সামাজিক অবস্থান দেখে মনে করি, তার জীবন আমাদের চেয়ে অনেক ভালো। অথচ আমরা জানি না সেই গাড়ির দরজা বন্ধ হওয়ার পর মানুষটি কতটা একা হয়ে পড়ে, সেই বড় বাড়ির দেয়ালের ভেতরে কত কান্না প্রতিদিন নীরবে প্রতিধ্বনিত হয়, সেই সাজানো সংসারে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কত দূরত্ব তৈরি হয়েছে। আমরা শুধু মানুষের জীবনের দৃশ্যমান অংশটি দেখি, অদৃশ্য অংশটি দেখি না। একজন মানুষের হাসির পেছনে কত কান্না, তার সাফল্যের পেছনে কত ব্যর্থতা, তার নিশ্চিন্ত মুখের আড়ালে কত ভয়, এসব আমরা জানি না। তাই অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করা আসলে নিজের প্রতি এক ধরনের অন্যায়। কারণ আমরা অন্যের জীবনের কেবল জানালাটি দেখি, পুরো ঘরটি দেখি না। যে মানুষটির জীবন দেখে আমরা ঈর্ষা করি, তার রাতটি হয়তো আমাদের চেয়েও অন্ধকার। আর যে মানুষটির অভাব দেখে আমরা তাকে অসুখী ভাবি, সে হয়তো তার সামান্য নিয়েই আমাদের চেয়ে অনেক বেশি শান্তিতে আছে।

জীবন আসলে কোনো সরল অঙ্ক নয়, যেখানে টাকা, বাড়ি, গাড়ি, সম্পর্ক, সন্তান আর সাফল্য যোগ করে সুখের ফলাফল বের করা যায়। জীবন এক গভীর দর্শন; এখানে প্রাচুর্যের মধ্যেও শূন্যতা থাকে, আবার শূন্যতার মধ্যেও পূর্ণতা জন্ম নেয়। কেউ সবকিছু পেয়েও শান্তি খুঁজে পান না, আবার কেউ প্রায় কিছুই না পেয়েও প্রতিদিন আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ থাকেন। কেউ ভালোবাসার মানুষের পাশে থেকেও একা, আবার কেউ দূরে থেকেও প্রিয় মানুষের স্মৃতিতে পূর্ণ। কেউ সন্তান পেয়েও তার মূল্য বোঝে না, আবার কেউ একটি সন্তানের মুখ দেখার আশায় সারাজীবন অপেক্ষা করেন। কেউ সংসার বাঁচাতে নিজের সুখ বিসর্জন দেন, আবার কেউ নিজের সুখের জন্য একটি সংসার ভেঙে ফেলেন। কেউ মুক্তি চায় সম্পর্ক থেকে, কেউ সম্পর্ক পাওয়ার জন্য জীবন পার করে দেয়। এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় রহস্য সম্ভবত এখানেই, মানুষ যা পায়, তার মূল্য অনেক সময় বোঝে না; আর যা হারায়, তার মূল্য বুঝতে বুঝতে জীবন ফুরিয়ে যায়।

তাই হয়তো আমাদের একটু থামা দরকার। অন্যের জীবনের দিকে তাকিয়ে ঈর্ষা করার আগে নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। যে মানুষটি আমাদের কাছে সাধারণ, হয়তো অন্য কারও কাছে সে-ই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষ। যে ঘরটিকে আমরা ছোট ভাবি, সেখানে হয়তো এমন ভালোবাসা আছে যা কোনো প্রাসাদে নেই। যে খাবারটিকে আমরা সামান্য মনে করি, সেটিই হয়তো কারও কাছে দিনের সবচেয়ে আনন্দের আয়োজন। যে সন্তানকে কেউ বোঝা ভাবে, অন্য কেউ হয়তো সেই সন্তানের একটি হাসির জন্য নিজের পুরো জীবন দিয়ে দিতে প্রস্তুত। যে স্ত্রীকে কেউ অবহেলা করে রাতের অন্ধকারে অন্য কোথাও চলে যায়, সেই স্ত্রীই হয়তো প্রতিদিন তার ফেরার অপেক্ষায় দরজার দিকে তাকিয়ে থাকেন। যে স্বামীকে কেউ গুরুত্ব দেয় না, সে হয়তো নীরবে নিজের পরিবারটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দিচ্ছে। আমরা কখনোই জানি না, আমাদের অবহেলা করা মানুষটির হৃদয়ে আমাদের জন্য কতটা জায়গা ছিল, কিংবা আমাদের কাছে তুচ্ছ মনে হওয়া কোনো সম্পর্ক অন্য একজনের কাছে কতটা মূল্যবান ছিল।

শেষ পর্যন্ত মানুষ তার জীবনের হিসাব টাকা দিয়ে মেলায় না; মেলায় স্মৃতি দিয়ে। মৃত্যুর কাছাকাছি গিয়ে হয়তো কেউ আর মনে রাখবে না তার ডাইনিং টেবিল কত দামি ছিল, গাড়িটি কত লাখ টাকার ছিল, বাড়িটি কত বড় ছিল কিংবা ব্যাংকে কত টাকা জমা ছিল। মনে থাকবে কে কঠিন সময়ে হাত ধরেছিল, কে অভিমান ভাঙাতে এগিয়ে এসেছিল, কে না খেয়ে নিজের খাবারটা ভাগ করে দিয়েছিল, কে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য নিজের কষ্ট লুকিয়েছিল, কে গভীর রাতে অপেক্ষা করেছিল, কে বলেছিল- ‘ভয় পেয়ো না, আমি আছি।’ শেষ পর্যন্ত মানুষ সম্পদের মালিক হয় না, মানুষ স্মৃতির মালিক হয়। পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গে করে কোনো প্রাসাদ নেওয়া যায় না, কোনো গাড়ি নেওয়া যায় না, কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেওয়া যায় না। সঙ্গে থাকে কেবল কিছু মুখ, কিছু ভালোবাসা, কিছু অনুশোচনা আর কিছু অসমাপ্ত গল্প।

একই পৃথিবী, একই আকাশ, একই রাত, অথচ কত ভিন্ন মানুষের জীবন। কেউ খাবারের সন্ধানে দৌড়াচ্ছে, কেউ খাবার হজম করার জন্য দৌড়াচ্ছে; কেউ ভালোবাসা পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে, কেউ পাওয়া ভালোবাসাকে হারিয়ে ফেলছে। কেউ সন্তান চায়, কেউ সন্তানকে পরিত্যাগ করছে। কেউ সংসার বাঁচাতে নিজের জীবনটুকু নিঃশেষ করছে, কেউ সেই সংসার থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে। কেউ লাখ টাকার টেবিলে বসেও তৃপ্ত নয়, কেউ পেয়াজ-কাঁচামরিচ দিয়ে পান্তা ভাত খেয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষের মতো হাসছে। হয়তো এটাই জীবন, এক বিশাল বৈপরীত্য, যেখানে প্রত্যেক মানুষ নিজের নিজের অভাব নিয়ে বেঁচে থাকে। আর জীবনের শেষ প্রান্তে এসে হয়তো আমরা বুঝতে পারি, সুখ আসলে অনেক কিছু পাওয়ার নাম নয়; সুখ হলো যা পেয়েছি, তার মূল্য বুঝতে পারা। কারণ মানুষ সারাজীবন যে সুখের পেছনে দৌড়ায়, অনেক সময় সেই সুখটি তার নিজের ঘরেই বসে থাকে, একজন প্রিয় মানুষের অপেক্ষায়, সন্তানের হাসিতে, মায়ের ডাকে, স্ত্রীর অভিমানে, স্বামীর নির্ভরতায়, কিংবা এক প্লেট পান্তা ভাতের পাশে রাখা একটি পেয়াজ আর কয়েকটি কাঁচামরিচে। জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তাই প্রাচুর্য নয়, তৃপ্তি। সবচেয়ে বড় সম্পদ অর্থ নয়, আপন মানুষ; আর সবচেয়ে বড় বিলাসিতা বড় ঘর নয়, একটি শান্ত হৃদয়।

মন্তব্য করুন

[wpdevart_facebook_comment curent_url="https://amaderbashundhara.com/archives/1699" order_type="social" title_text="" title_text_color="#000000" title_text_font_size="22" title_text_font_famely="monospace" title_text_position="left" width="100%" bg_color="#d4d4d4" animation_effect="random" count_of_comments="3" ]
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

টোকিওতে তারেক–তাকাইচি আলোচনা: জাপানি পুঁজিকে ঢাকায় আসার আমন্ত্রণ

১

শ্রীপুরে মাদকাসক্ত ছেলের লাঠির আঘাতে প্রাণ গেল বাবার

২

মাদক মামলার আসামি, কে এই রবিউল ইসলাম ওরফে মিঠু মুন্সি?

৩

নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যে ফেনী সদর যুবদলের নিজাম পাটোয়ারী ও শাহাদাতকে অব্যাহতি

৪

সাংবাদিক হত্যা ও মিথ্যা মামলার প্রতিবাদে শ্রীপুরে সাংবাদিকদের কর্মসূচি

৫

অবিচার ছাপিয়ে সত্যের জয়: বঞ্চনার ১৭ বছর পর জনপ্রশাসন সচিব হলেন কামরুজ্জামান চৌধুরী

৬

এসএসপি নেতা আবদুল মান্নানের বোনজামাই মোছুদের রহমানের ইন্তেকাল, সভাপতি-সম্পাদকের শোক

৭

ডিবি পুলিশের অভিযান : লৌহজংয়ে মালিরঅংক থেকে হেরোইনসহ ৪ জন গ্রেপ্তার

৮

৪২৩ জনের কারাগারে ২১৬৪ বন্দী ধারণক্ষমতার পাঁচ গুণ, কারাগারে চরম চাপ

৯

একদিকে রাড্ডা অন্যদিকে সমবায় সমিতি মাঝখানে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন থমথমে অবস্থা মিরপুরে বিএনপির রাজনীতি, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ কেন নীরব দায়ভার কার?

১০

ওসি জাহাঙ্গীর আলমের বিদায়ে শাহআলী এলাকাবাসীর উদ্বেগ: নেপথ্যে কি চাঁদাবাজ ও মাদকচক্রের ষড়যন্ত্র!

১১

উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো এসএসপির ৮ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী

১২

এসএসপি দপ্তর সম্পাদক মীম আক্তারের পিতার ইন্তেকাল, নেতৃবৃন্দের শোক

১৩

কেউ বলে মামলাবাজ কেউ বলে প্রতারক কে এই মিরপুরের হান্নান?

১৪

ঝিনাইদহে ব্যবসায়ীকে চাঁদা ও জমি দখলের হুমকির অভিযোগ

১৫

ফেনীতে কৃষকদল নেতা আমিনুল হক বহিষ্কার

১৬

​১ গানে ১৬৩ মিলিয়নের অধিক ভিউয়ের মাইলফলক: উদযাপিত হলো শিশুশিল্পী সুরাইয়া আক্তার সাইফার ‘গোল্ডেন প্লে বাটন সেলিব্রেশন’

১৭

হেফাজতে নারী ব্যবসায়ীকে মারধর, উঠেছে নানা প্রশ্ন

১৮

যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত পরিদর্শন করেন গঙ্গাচড়ায় প্যারাগন গ্রুপের ডেইরি ফার্ম 

১৯

চন্দ্রিমা মডেল টাউনে অনুমোদনহীন ১৮ তলা ভবন নীরব রাজউক

২০

একই পৃথিবী, অথচ কত ভিন্ন জীবন

26 August 2026
« « « বিস্তারিত কমেন্টে » » »
Amaderbasundara
www.amaderbashundhara.com