রুমান খাঁন স্টাফ রিপোর্টার : যৌবনের শুরুতেই পরিবারের অভাব ঘুচাতে ওমানের তপ্ত মরুভূমিতে পাড়ি জমিয়েছিলেন বিল্লাল মিয়া। দীর্ঘ ৪২ বছর হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে তিন ভাই আর নয় বোনের মুখে হাসি ফুটিয়েছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন সবাইকে।
কিন্তু জীবনের শেষ অপরাহ্ণে এসে এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ আজ নিজ দেশেই এক নিষ্ঠুর বাস্তবতার মুখোমুখি। নিজের কষ্টার্জিত অর্থে কেনা বসতভিটায় আজ তিনি ‘পরবাসী’। একদল স্থানীয় দখলদারের দাপটে আজ তিনি নিজ জমিতেই অবাঞ্ছিত।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার পানিশ্বর ইউনিয়নের বেড়তলা গ্রামের মৃত হাজী আব্দুল আলীর জ্যেষ্ঠ পুত্র বিল্লাল মিয়া ১৯৮২ সালে পাড়ি জমান ওমানে।
প্রবাসে থাকাকালীন নিজের আয়ের প্রায় সবটুকু ব্যয় করেছেন ভাই-বোনদের মানুষ করতে। নিজের জন্য কিনেছিলেন একখণ্ড জমি, যেখানে শেষ বয়সে পরিবার নিয়ে শান্তিতে বসবাসের স্বপ্ন ছিল তার।
কিন্তু সম্প্রতি দেশে ফিরে তিনি দেখেন, তার অনুপস্থিতির সুযোগে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজন তার জমি অবৈধভাবে দখল করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, বাড়ি থেকে বের হওয়ার একমাত্র চলাচলের পথটিও বন্ধ করে দিয়েছে দখলদারেরা।
অসুস্থ শরীরে হার্ট বাইপাস সার্জারির ধকল নিয়ে বিল্লাল মিয়া যখন স্থানীয় বিচারক ও মুরুব্বিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন, তখন মিলছে না কোনো কার্যকর সমাধান। উল্টো তাকে শুনতে হচ্ছে এক অদ্ভূত যুক্তি— “আপনার তো অনেক সম্পদ আছে, ওদের থাকতে দিন!” এই তথাকথিত ‘দয়া’র তত্ত্বে ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী পরিবার। প্রশ্ন উঠেছে, একজনের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে অন্যকে বসিয়ে দেওয়ার অধিকার সমাজ বা রাষ্ট্র কাকে দিয়েছে? বিল্লাল মিয়ার পুত্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার বাবা তার জীবনের ৪২টি বছর দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। আজ তিনি অসুস্থ। এই বয়সে যখন তার শান্তিতে থাকার কথা, তখন তাকে নিজের অধিকারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে অনেক ধৈর্য ধরেছি, কিন্তু অন্যায়ের একটা সীমা আছে। অবিলম্বে আমাদের পৈতৃক জমি দখলমুক্ত এবং চলাচলের রাস্তা উন্মুক্ত করতে হবে।”
বর্তমানে বিল্লাল মিয়া ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। দখলদারেরা বারবার জমির সীমানা খুঁটি উপড়ে ফেলে দিচ্ছে এবং হুমকি প্রদান করছে। এই বিষয়ে সরাইল উপজেলা প্রশাসন এবং জেলা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। একজন প্রবাসীর সারাজীবনের অর্জন যেন এভাবে লুটেরাদের হাতে চলে না যায়, সেটিই এখন সচেতন মহলের দাবি। দেশের অর্থনীতির চাকা যারা সচল রাখেন, সেই প্রবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। বিল্লাল মিয়ার এই কান্না যেন অরণ্যে রোদন না হয়, সেজন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সচেতন সমাজ ও প্রশাসনের সুদৃষ্টি এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন